ক. 'কাশফ' আরবি শব্দ। এর অর্থ খোলা, উন্মুক্ত হওয়া বা রহস্যের দ্বার উন্মোচিত হওয়া।
খ. ফানাফিল্লাহ আরবি শব্দ। ফানা অর্থ আত্মবিনাশ, ফিল্লাহ অর্থ আল্লাহতে। ফানাফিল্লাহর অর্থ হলো আল্লাহতে আত্মবিনাশ। এটি সুফি সাধনার একটি স্তর। এ স্তরে সুফি সাধক তন্ময়তার মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত চেতনাকে মুছে দিয়ে ঐশী চেতনায় উন্নীত হয়। আর এ স্তর অতিক্রম করে সুফি সাধক বাকাল্লিাহর স্তরে পৌঁছে যায়।
গ. উদ্দীপকে ইলমে তাসাউফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। ইলমে তাসাউফ উৎপত্তির সম্পর্কে কতকগুলো মতবাদ প্রচলিত রয়েছে।
ইলমে তাসাউফের উৎপত্তিসংক্রান্ত মতবাদগুলো হলো- ১. বেদান্ত বা বৌদ্ধ দর্শন প্রভাব মতবাদ। এইচ. মোর্টন ও গোল্ডেন জিহার এ মতবাদের পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের মতে, সুফিবাদ বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাবে উদ্ভূত হয়েছে। তাদের ধারণাটি ভুল। ২. ঈসায়ি বা নিউপ্লেটোনিক প্রভাব মতবাদ। অধ্যাপক নিকলসন ও ডনক্রেমারের নিউপ্লেটোনিক চিন্তাধারা থেকে ইসলামে সুফিবাদের সূত্রপাত হয়। এসব নিউপ্লেটোবাদী দার্শনিক গ্রিক দর্শনের আলোকে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে থাকেন। নবম শতাব্দীতে ইসলামের জ্ঞান বিজ্ঞানের স্বর্ণ যুগে গ্রিক দর্শন ও খ্রিস্ট মরমিবাদ মুসলিম চিন্তাবিদদের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। এর ফলেই মুসলমানদের মাঝে সুফিবাদের জন্ম নেয়। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাদের এ মতবাদও সঠিক নয়। ৩. পারসিক প্রভাব মতবাদ। দার্শনিক ব্রাউন ও তাঁর অনুসারীদের মতে, পারসিক প্রভাব থেকে ইসলামি সুফিবাদের সূত্রপাত হয়েছে। পারসিকরা সুফিবাদের মূল প্রবর্তক এ কথা ঠিক নয়। কেননা মুসলমানগণ পারস্য গমনের পূর্বেই এর উৎপত্তি হয়েছে। তবে সুফিবাদের বিস্তার ও উন্নতিতে পারসিকদের অবদান রয়েছে, এটুকু বলা যেতে পারে। ৪. কুরআনি প্রভাব মতবাদ। ইসলাম সুফিবাদ সম্পূর্ণরূপে অনুমোদন করে। ইমাম গাযালি, ইবনে খালদুন ও আল্লামা ইকবাল (র.) মনে করেন- কুরআনের আধ্যাত্মিক শিক্ষায় মুসলমানদের মাঝে সুফিবাদের জন্ম নেয়। মূলত ইসলামের অন্তর্নিহিত ভাবধারার প্রেক্ষাপটে সুফিবাদের উৎপত্তি। অর্থাৎ কুরআন ও হাদিসই সুফিবাদের মূল উৎস। সুফিবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সমর্থনে কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। নিচে এ জাতীয় কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা হলো— ১. اَللهُ نُوْرُ السَّمَوْتِ وَالْأَرْضِ অর্থাৎ, “আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীর জ্যোতি।” ২. وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ অর্থাৎ, “আর আমার বান্দা যখন তোমার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের সন্নিকটেই আছি। কোনো আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই।” ৩. وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ অর্থাৎ, “দ্যালোক ভূলোকব্যাপী তার সিংহাসন বিদ্যমান।” (সূরা বাকারা : ২৫৫)
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের বিষয়টি অর্থাৎ, তাসাউফের উৎপত্তি সম্পর্কে উল্লিখিত মতবাদগুলো প্রচলিত রয়েছে।
ঘ. উদ্দীপকের বিষয়টি হলো ইলমে তাসাউফ। ইলমে তাসাউফের ক্রমবিকাশের ধারা শুরু হয় রাসুল (সা.)-এর যুগ থেকে ।
রাসুল (সা.)-এর যুগেই তাসাউফ বা সুফিবাদের সূত্রপাত ঘটে। যেমন —রাসুল (সা.)-এর নবুয়ত লাভের পূর্ববর্তী দীর্ঘ সময় ধরে হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যানমগ্ন থাকার মধ্যে তাসাউফের মোরাকাবা পদ্ধতির বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। অনুরূপ আরও বহু দৃষ্টান্ত রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের জীবনে পাওয়া যয়। যেমন রাসুল (সা.) তাঁর নবুয়তের ২৩ বছর পুরোটাই, দিনে কঠোর সাধনা ও রাতে অবিরাম ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। তাঁর জীবনের এমন কোনো রাত অতিবাহিত হয়নি যে, তিনি উক্ত রাতে তাহাজ্জুদ নামায ও অন্যান্য নফল ইবাদত করেননি। রাসুল (সা.)-এর রাত্রিকালীন ইবাদত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَظَنَّا وَأَقْوَمُ قِيلًا অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই ইবাদতের জন্য রাত্রিতে ওঠা প্রবৃত্তি দমনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।” (সূরা মুয্যাম্মিল : ৬) ইসলামের প্রথম চার খলিফা জগতের কর্মব্যস্ত শাসক হওয়া সত্ত্বেও পার্থিব জাঁকজমক ত্যাগ করে সময় সময় আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হতেন। হযরত ওসমান (রা.)- এর শাহাদাতের পর মুসলিম সমাজে সুফিবাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ্য, হযরত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে মসজিদে নব্বীতে জুমআর দিনে খুতবার সময় বলেন- يَأْسَارِيَةَ الْجبل الْجَبَلُ অর্থাৎ, “হে সারিয়া! পর্বতের দিকে (লক্ষ কর) পর্বতের দিকে (লক্ষ কর)।” খুতবা দেওয়ার সময় তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে জ্ঞাত হলেন, শত্রু সেনারা নাহওয়ান্দ নামক রণক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু মুসলিম বাহিনী সে ব্যাপারে বেখবর ছিল। এ অবস্থায় তিনি তাদের সতর্ক করার জন্য এ সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ নির্দেশ বাণীটি তখনই সারিয়ার কাছে পৌঁছেছিল এবং সে মোতাবেক রণকৌশল গ্রহণ করায় সমূহ ক্ষতি থেকে তারা রক্ষা পেয়ে গেলেন। উমাইয়া যুগে তাসাউফের বিকাশ পূর্ণতা লাভ করে । উমাইয়া যুগের শ্রেষ্ঠ সুফি ছিলেন আবু ইসহাক ইমাম হাসান বসরি (র.) ও রাবেয়া বসরি (র.), আবু হাশিম (র.), ইবরাহিম ইবনে আদহাম (র.), মারুফ আল কারখি (র.) প্রমুখ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ হিসেবে প্রসিদ্ধ আব্বাসি শাসনামলে তাসাউফ বা সুফি মতবাদ পূর্ব নিয়মানুযায়ী চলতে থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, ইলমে তাসাউফের ক্রমবিকাশের ধারা শুরু হয় মূলত রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে, যা অদ্যাবধি বিদ্যমান।