ক.
১৮৫৮ সালে মুঘল শাসনামলের অবসান ঘটে ।
খ.
ভারতে মারাঠা অভ্যুত্থানের মহানায়ক ছিলেন শিবাজী ।
১৬২৭ সালে মারাঠা পরিবারে শিবাজী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহজী ভোসলে এবং মাতা জিজাবাঈ। গুরু রামদাস ও তুকরামের অনুপ্রেরণায় শিবাজী ভারতে স্বাধীন হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন । এ লক্ষ্যে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের মারাঠা কৃষিজীবীদের সংগঠিত করে মারাঠাদের জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ এক সংগ্রামী জাতিতে পরিণত করেন । এজন্য তাকে মারাঠা জাতীয়তাবাদের মহানায়ক বলা হয় ।
গ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত শাসকের সাথে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির সাদৃশ্য পাওয়া যায় ।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনকালের ইতিহাসে তার দাক্ষিণাত্য নীতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। বিজাপুর, গোলকুণ্ডাসহ দাক্ষিণাত্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ মুঘল সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হওয়ার কারণে তাদের দমনে সম্রাট বিশেষ নীতি গ্রহণ করেন। এটিই ইতিহাসে দাক্ষিণাত্য নীতি নামে পরিচিত । উদ্দীপকে এ নীতিরই প্রতিচ্ছবি লক্ষণীয়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, সিকান্দার সাহেব শাসন ক্ষমতা লাভের পর তার সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে চরম বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ বিদ্রোহ দমনে তিনি উল্লিখিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ নীতি প্রবর্তন করেন। অধিক অর্থ বরাদ্দ, সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনী মোতায়েন, যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ ও স্বয়ং যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান প্রভৃতি পদক্ষেপের মাধ্যমে উক্ত বিদ্রোহ দমনে তিনি আংশিক সাফল্য লাভ করেন। অনুরূপভাবে সম্রাট আওরঙ্গজেব শাসন ক্ষমতা লাভের পর দাক্ষিণাত্যের (দক্ষিণ ভারত) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাজ্যসমূহে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ সব রাজ্যসমূহ সম্রাট আওরঙ্গজেবকে কর প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠাদের শক্তি বৃদ্ধি দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করে। এই মারাঠাদের গোলকুণ্ডা ও বিজাপুর রাজ্য বিভিন্ন সামরিক সহযোগিতা দিতে থাকে। তাদের মুঘল বিরোধী কার্যকলাপে মুঘল সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তাই সম্রাট আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডা, বিজাপুর দখল ও মারাঠাদের দমন করার সর্বাধিক পরিকল্পনা তথা দাক্ষিণাত্য নীতি গ্রহণ করেন। প্রচুর অর্থ ব্যয়, সামরিক সৈন্য মোতায়েন এবং নিজে যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে সম্রাট ১৬৮১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তার জীবনের শেষ পর্যন্ত দাক্ষিণাত্য অধিকার করেই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান। তার এ সাফল্য আপাতদৃষ্টিতে অনেক কিছু মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সম্রাট পুরোপুরি সাফল্য লাভে ব্যর্থ হন। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত শাসকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি মুঘল রাজবংশের পতনের অন্যতম কারণ— মন্তব্যটি যথার্থ ।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি মুঘল ও ভারতবর্ষের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন, "The Deccan was not only the grave of his body but also of his empire." অর্থাৎ দাক্ষিণাত্য নীতি শুধু সম্রাটের নিজেরই সমাধিক্ষেত্র নয়, তার সাম্রাজ্য তথা মুঘল সাম্রাজ্যেরও সমাধিক্ষেত্র ছিল।
সম্রাট আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য নীতিতে সাফল্য লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে সব কিছুই হারান। ১৬৮২ হতে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সম্রাটের একটানা দাক্ষিণাত্যে অবস্থানের ফলে উত্তর ভারতে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। উত্তরার্ধে সম্রাটের অনুপস্থিতিতে মুঘল নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে। দাক্ষিণাত্য জয়ের ফলে সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। দাক্ষিণাত্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হওয়ার ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেয়। দিল্লি হতে দাক্ষিণাত্য গমন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ১,৭৭,০০০ সৈন্যের ভরণপোষণ করতে গিয়ে মুঘল রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। সেনাদের বেতন ভাতা বকেয়া পড়ায় সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া মুঘলদের বিরুদ্ধে মারাঠাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে উৎসাহিত হয়ে আফগান, শিখ, জাঠ, মেওয়াটি ও রাজপুত্ররা চারিদিক দিক থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায়। মুঘলদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দেয়। উত্তর ভারতে সম্রাটের অনুপস্থিতি বাংলায় ইংরেজ শক্তির উত্থান, নিষ্কণ্টক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় মুঘল সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে ধাবিত করে।
উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে।