ক.
এক খাদ্যের সাথে অন্য খাদ্য মিশ্রণ, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ, খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিকর দ্রব্য ব্যবহার, খাদ্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রং প্রয়োগ ইত্যাদি একত্রে খাদ্যে ভেজাল বা ভেজাল খাদ্য বলে পরিচিত।
খ.
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও ক্রয়যোগ্যতা নিশ্চিতকরণের সাথে সাথে তা নিরাপদ করাও প্রয়োজন। নিরাপদ খাদ্য মানুষকে সুস্থ সবল রাখে; ফলে সে জীবনের বেশিরভাগ সময় কর্মক্ষম থাকে। খাদ্য নিরাপদ হলে রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং কর্মক্ষম থাকা সম্ভব হয়। নিরাপদ খাদ্য পুষ্টিসমৃদ্ধ হয় বলে তা থেকে পুষ্টি আহরণ সম্ভব হয় যা দেহ ও মনের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটায়। তাই খাদ্য নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন।
গ.
উদ্দীপকে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার জন্য কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো:
বাংলাদেশের ভূমিস্বত্ব প্রথার বড় একটি ত্রুটি হলো- কৃষিখাতে ভূমিহীন কৃষকের অস্তিত্ব। ত্রুটিপূর্ণ ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থার কারণে এদেশের প্রায় এক- তৃতীয়াংশ কৃষকই ভূমিহীন। তারা খাদ্যশস্য বা অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমি চাষ করে। চাষকৃত জমি নিজেদের না হওয়ায় তারা পূর্ণ উদ্যমের সাথে কৃষিকাজ করে না। ফলে ফলন কম হয়। এ অবস্থায় খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ে না এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করে।
বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বর্গাচাষ প্রথা প্রচলিত আছে। এখানে চাষকৃত জমি বর্গাচাষির না হওয়ায় এবং জমির মালিক কর্তৃক যেকোনো সময়ে জমি থেকে উৎখাত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় না। এজন্য খাদ্য প্রাপ্তির পরিমাণ তেমন বাড়ে না।
বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে খাদ্য গুদামজাতকরণের দারুন অভাব রয়েছে। খাদ্য গুদামজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে তা ঠিকমতো ও পর্যাপ্ত পরিমাণে গুদামজাত করা যায় না। সংরক্ষণজনিত ত্রুটির জন্যও গুদামজাতকৃত খাদ্যের একাংশ বিনষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ডিজেল ও গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় পরিবহণ ভাড়াও যথেষ্ট বেড়েছে। ফলে সব জায়গায় খাদ্যের যোগান ঠিকমতো দেওয়া যাচ্ছে না।
খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম দিক হলো খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি। উপরে উল্লিখিত কারণগুলোর জন্য তা বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
ঘ.
সাম্প্রতিককালে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে সরকার টেকসই কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সরকারের এ পদক্ষেপ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য যথেষ্ট নয়; এ ব্যাপারে আরো কিছু করণীয় আছে। এগুলো নিম্নরূপ:
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল বলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের হার ও তীব্রতা উভয়ই বাড়তে পারে। এর ফলে খাদ্যোৎপাদনের পরিমাণ ও তার মজুদ অনেকটাই কমে যেতে পারে যা অবশ্যই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পথে অন্যতম অন্তরায়। এ প্রেক্ষিতে বৃহত্তর স্বার্থে চাল ও গমের বাফার স্টকের পরিমাণ বাড়ানো উচিত যাতে তার দ্বারা উদ্ভূত খাদ্য সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।
বাংলাদেশে যেহেতু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে হঠাৎ করে খাদ্যোৎপাদন বিপুল পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব নয়, তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেই বিদ্যমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার কর্তৃক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসবে। তখন অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করেও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা যাবে। দেশে খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে হলে কৃষকদের খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্য উৎপাদনের উদ্ভাবিত নবতর উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। একই সাথে উৎপাদিত খাদ্য দেশে-বিদেশে যাতে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে আইসিটি মারফত কৃষকরা তাদের কম্পিউটারের সাহায্যে ঘরে বসেই আবহাওয়া, কৃষি উৎপাদন ও চাষাবাদের নতুন নতুন কৌশল, উদ্ভিদের পরিপুষ্টিকর ও পানির ব্যবহার, কৃষিপণ্যের চাহিদা, বিদ্যমান দাম, পশু-পাখির রোগ ও তার প্রতিষেধক ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এভাবে সমগ্র কৃষি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হলে তা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে যথেষ্ট সহায়ক হবে।
সুতরাং, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য উদ্দীপকে উল্লিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়াও সরকার উপরিউল্লিখিত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন নিশ্চিত করতে পারে।