ক.
নূরজাহানের প্রকৃত নাম মেহেরুন্নেসা।
খ.
মুঘল সম্রাট আকবর সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তা-ই মনসবদারি প্রথা নামে পরিচিত।
'মনসব' শব্দের অর্থ পদ বা মর্যাদা। এ পদের অধিকারীকে 'মনসবদার' বলা হয়। সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের অব্যবস্থা দূর করার জন্য সম্রাট আকবর ১৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে শাহবাজ খানকে মীর বকশী (সামরিক বাহিনীর প্রধান) নিয়োগ করে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এটিই 'মনসবদারি প্রথা'। এ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ের মনসবদার তাদের অধীনে যথাক্রমে মোট দশ হাজার এবং ১০ জন সৈন্য রাখতে পারতেন।
গ.
উদ্দীপকে বর্ণিত খলিফা আল হাকিমের সাথে মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন আকবরের মিল রয়েছে।
মুঘল সম্রাট আকবর ছিলেন সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তাই নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাকে তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। সব ধর্মের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তিনি সাম্প্রদায়িকতা দূর করার মাধ্যমে নিজেকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে একটি নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেন। এটি 'দ্বীন-ই-ইলাহি' নামে পরিচিত। তবে উদ্দেশ্যগত দিক দিয়ে তার এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি, যেমনটি খলিফা আল হাকিমের প্রবর্তিত ধর্মমতের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
খলিফা আল হাকিম রাজ্যের সকল ধর্মাবলম্বীকে একই পতাকাতলে সমাসীন করতে একটি নতুন ধর্মমত চালু করেন। কিন্তু এটি তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। একই পরিস্থিতি সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত 'দ্বীন-ই-ইলাহি', ধর্মমতের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। মুঘল সম্রাট আকবরও সুলহ-ই-কুল (ধর্মীয় সহিষ্ণুতা) নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভারতের বুকে 'দ্বীন-ই-ইলাহি' নামক একটি জাতীয় ধর্ম প্রবর্তন করেন। ঐতিহাসিক বাদাউনী এটিকে তৌহিদ-ই-ইলাহি বা ঐশী একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন, 'সব ধর্মের উৎকৃষ্ট নীতিমালার সমন্বয়ে গঠিত এটি একটি সর্বেশ্বরবাদী ধর্ম।' বস্তুত এটিকে একটি স্বতন্ত্র ধর্ম না বলে ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে অভিহিত করাই সমীচীন। এই মতবাদের অনুসারীবৃন্দকে সম্রাটের নামে তাদের সম্পত্তি, জীবন, সম্মান ও ধর্ম এই চারটি জিনিস উৎসর্গ করতে হতো। এ ধর্মের বিধান অনুযায়ী সম্রাটকে সিজদাহ করতে হতো। তবে মাত্র ১৮ জন এ ধর্মমত গ্রহণ করেছিলেন। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর সাথে সাথে এ ধর্মমতের বিলোপ ঘটে। সুতরাং বলা যায়, ধর্মমত প্রবর্তনের দিক দিয়ে খলিফা আল হাকিমের সাথে সম্রাট আকবরের মিল রয়েছে।
ঘ.
উক্ত সম্রাটের অর্থাৎ সম্রাট আকবরের 'রাজপুত নীতি' তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ছিল।
সম্রাট আকবর উপলব্ধি করেছিলেন যে, সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী করতে হলে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী রাজপুতদের সক্রিয় সহযোগিতা ও সমর্থন অপরিহার্য। এ জন্য তিনি রাজপুত বংশের সাথে বৈবাহিক মিত্রতা স্থাপন করেন। ফলে তিনি রাজপুতদের বন্ধুত্ব ও সমর্থন লাভ করেন। আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আকবর রাজপুতদের প্রশাসনিক ও সামরিক বিভাগের উচ্চপদগুলোতে নিযুক্ত করে তাদের সহানুভূতি ও সহযোগিতা লাভ করেন। আবার, বিজিত রাজ্যগুলোর শাসনভার রাজপুতদের হাতে ছেড়ে দিয়ে সাম্রাজ্যের ভিতকে শক্তিশালী করেন।
রাজপুতদের প্রতি সম্রাটের বন্ধুত্বসুলভ মনোভাব ও সদয় আচরণ ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে। এর ফলে রাজ্যবিস্তার ও রাজ্যশাসনের ব্যাপারে এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রগতির ক্ষেত্রে হিন্দু তথা রাজপুতরা অনস্বীকার্য অবদান রাখে। রাজপুতদের প্রতি আকবরের উদার আচরণের ফলে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুজাতি আকবরকে বিদেশি শাসক বলে মনে করেননি রাজপুত সেনানিদের সাহায্যেই আকবর বিস্তীর্ণ মেবার অধিকার করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং তার বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সম্রাট আকবর কখনই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিংবা ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে রাজপুতনায় হস্তক্ষেপ করেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি সব রাজপুতকে নিজ রাজ্যের অংশীদার করে নেওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায় মুঘল সাম্রাজ্যের অনুগত হয়ে পড়েছিল। রাজপুত নীতিই আকবরকে মধ্যযুগের ভারতবর্ষের ইতিহাসে উদারতার এক মূর্ত বিগ্রহে পরিণত করেছে। এ নীতির সূত্র ধরেই তিনি 'মহামতি' আখ্যায় ভূষিত হয়েছেন।
উপরের আলোচনা হতে একথা সুস্পষ্ট যে, সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতির কারণে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত সুদৃঢ় ও শতাধিক বছর স্থায়ী হয়েছিল।