ক.
হাজি শরীয়তউল্লাহ ১৭৮১ ফরিদপুর জেলায় মাদারীপুর মহকুমা (বর্তমান জেলা) জন্মগ্রহণ করেন।
খ.
বঙ্গভঙ্গ ছিল মূলত একটি প্রশাসনিক সংস্কার। বাংলার আয়তন ছিল ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং ১৯০৩ থেকে এর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লক্ষ। এ বিশাল আয়তনের ফলে পূর্ব বাংলার অনেকগুলো জেলা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অবহেলিত ছিল। ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিক্ষা ছিল অবহেলিত। নদ-নদী ও খাঁড়িসমূহ দ্বারা অত্যধিক বিছিন্ন পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে পুলিশি কাজ চালানো ছিল বেশ অসুবিধাজনক। জলপথে সংঘবদ্ধ জলদস্যুতা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি, দুর্ভিক্ষ, প্রতিরক্ষা এবং ভাষাগত সমস্যা সরকারকে বঙ্গভঙ্গ করতে উৎসাহিত করে।
গ.
ক' চিত্রের ছবিটি লর্ড ক্লাইভের। তিনি যে বিশেষ শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেন তা হলো দ্বৈতশাসন।
রবার্ট ক্লাইভ কর্তৃক দ্বৈতশাসন প্রবর্তনের ফলে জনসমাজে মারাত্মকভাবে কুপ্রভাব পড়ে এবং প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি পায়। শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে নবাবকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তার হাত-পাছিল বাঁধা। কোম্পানি মুহম্মদ রেজা খানকে নায়েব সুবাদার নারেখ। দিওয়ান নিয়োগ করে। একইভাবে বিহারে সিতাব রায়কে সুবাদার (নাজিম) ও নায়েব দিওয়ান নিযুক্ত করা হয়। এর ফলে এক দ্বৈতশাসনের সৃষ্টি হয়। রবার্ট ক্লাইভ লবণ, সুপারি ও তামাকের একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্যে একটি আলাদা সংস্থা গড়ে তোলে। এর লভ্যাংশ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে দেওয়া হয়। এতে এদেশীয় ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও বেশকিছু ব্যবসায় বাণিজ্যকে সরকারিকরণ করা হয়। এতে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বৈতশাসনের ফলে নবাবের দায়িত্ব ছিল কিন্তু ক্ষমতা ছিল না। অপরদিকে কোম্পানির ক্ষমতা ছিল কিন্তু কোনো দায়িত্ব ছিল না। ফলে এ শাসনব্যবস্থায় সুশাসনের দায়িত্ব প্রকৃতপক্ষে কোম্পানি বা নবাব কেউই গ্রহণ করেনি। কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও দ্বৈতশাসনের ফলে কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কৃষকদের ওপর করভার অমানবিক পর্যায়ে চলে যায়। অনেকে পেশা পরিবর্তন করে পালিয়ে বেড়ায়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে রেজা খানের অভিযোগ থেকে জানা যায়, আলীবর্দী খানের শাসনামলে পূর্ণিয়া জেলায় রাজস্ব ছিল ৪ লক্ষ টাকা, কিন্তু ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ লক্ষ টাকায় ওঠে। একইভাবে দিনাজপুরের রাজস্ব ১২ লক্ষ হতে বৃদ্ধি পেয়ে তা ১৭ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। রেজা খানকে চাপের মুখে এ বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হয়।
কারণ কোম্পানি শুধু চাইতো জনগণের উন্নয়নের কৃষিখাতে, রাস্তাঘাটের উন্নয়নে বা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ ব্যয় করত না। ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ রেজা খান কোম্পানির অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন। এতে দ্বৈতশাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের সামান্য নমুনা ছিল।
ঘ.
'খ'-এর চিত্রটি হলো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষের।
১১৭৬ বাংলা বা ১৭৬৯-৭০ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষ বাংলার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। দ্বৈতশাসনের ফলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা, ইংরেজদের অর্থলোলুপতা, ভূমি রাজস্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি, কৃষিতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, প্রাকৃতিক অনাবৃষ্টি সব কিছু মিলিয়ে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মে দুর্ভিক্ষের প্রকোপ সর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পায়। ক্ষুধার তীব্রতায় মানুষের আহাজারিতে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। না খেয়ে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চারদিকে লাশ আর লাশ। ১ টাকায় যেখানে ১ মণ চাল পাওয়া যেত, এ দুর্ভিক্ষের সময় তখন ১ টাকায় ৩ সের পাওয়া ছিল দুর্লভ। কোম্পানির কর্মচারী ও গোমস্তারা অধিক মুনাফা লাভের আশায় খাদ্যদ্রব্য মজুতদারি করে। এর ফলে এ দুর্ভিক্ষ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। মুর্শিদাবাদ হতে কোম্পানির আবাসিক প্রতিনিধি রিচার্ড বেচার ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জুন এক রিপোর্ট দেন। তিনি লিখেন, "এ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য, এর বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। দেশের কোনো কোনো অংশে মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত মানুষ ভক্ষণ করছে। তা গুজব নয়, সত্যি। অনাহারজনিত মৃতের সংখ্যা প্রতি ষোলজনের মধ্যে ছয়জন।" অনাহারী মানুষকে বাঁচানোর জন্য সরকার বিভিন্ন জেলায় লঙ্গরখানা খোলে এবং কিছু অর্থের বরাদ্দ দেয়। কিন্তু তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প। এ দুর্ভিক্ষের এক পরোক্ষ ফল ছিল দ্বৈতশাসনের অবসান। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষ দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজস্ব শাসনের দায়িত্বভার নিজ হাতে গ্রহণ করে।
এরপর কয়েক বছরের মধ্যে প্রশাসন যন্ত্রের উচ্চপদ হতে সকল দেশীয়দের সরিয়ে দিয়ে ইংরেজদের নিয়োগ দেওয় হয়। এভাবে দ্বৈতশাসনের কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটে।