ক.
হিজরত শব্দের অর্থ দেশত্যাগ বা একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া।
খ.
জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে যারা হিজরত করেন তাদেরকে ইসলামী মহাজির এবং যারা হিজরতকারীদের সর্বত্তোভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন তাদেরকে আনসার বলা হয়। মক্কা ইসলাম প্রচারের কারণে মহানবী (সাঃ) এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। এই কারণে আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা) সহ আরো অনেকে জন্মভূমি ও আত্মীয়-স্বজনের মায়া কাটিয়ে মদিনায় গিয়ে হিজরত পালন করেন। এভাবে মদিনায় আশ্রয় নেওয়ার কারণে মুসলমানদের মহানবী (সাঃ) মহারিজ হিজরতকারী নামে অভিহিত করেন। আর যারা আশ্রয় দেন তাদেরকে তিনি আনসার সাহায্যকারী বলে ঘোষণা করেন।
গ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত সনদের সাথে মহানবী সা. প্রণীত মদীনা সনদের সাদৃশ্য আছে। নিম্নে তা ব্যাখ্যা করা হলো :
সকল মানুষের সহজাত মর্যাদা, সমান অধিকার ও সহমতা রক্ষার কথা উল্লেখ করে ১৯৬৮ সালে ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করে United Nations General Assembly. এই সনদে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং সকল বর্ণ ও ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। যা বিশ্বমানবের সকলকে একই সূত্র গ্রথিত করে।
হিজরতের পর মহানবীও মদিনার সকল মানুষের অধিকার সংরক্ষণের জন্য মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদে ছিল ৪৭ টি ধারা। এই সনদের মাধ্যমে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার রক্ষার মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গঠনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। হিজরতের পর মহানবী দেখেন মদিনায় অশান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ্ব-কলহ। সেখানে ছিল না মানুষের সকল অধিকার আর ছিল দুর্বলদের উপর সবল দের অত্যাচার। তাই মহানবীর সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিতের জন্য সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সনদ প্রণয়ন করেন, যা মদিনা সনদ নামে পরিচিত। এটিই ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান। এই সনদের ধারাগুলো ছিল মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অধিকারের রক্ষাকবচ। এই সনদের মাধ্যমে তিনি মদিনায় বসবাস সদস সকল ধর্ম এবং গোত্রের মানুষদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একের বিপদে অন্যকে পাশে থাকার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেন। এছাড়াও এই সমাজে তিনি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কে সমান অধিকার প্রদানের ঘোষণা দেন। তাছাড়া সকল ধর্মের মানুষকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার প্রদান করেন। এই সনদে তিনি সকল অপরাধমূলক কাজকে নিষিদ্ধকরণ এবং অসহায় দিয়ে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানান। যার ফলে সমগ্র মদিনাবাসী একটি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সকলের অধিকার সুনিশ্চিত হয়।
তাই বলা যায়, সকলের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সবাইকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করার দিক থেকে উদ্দীপকে উল্লিখিত সনদের সাথে মহানবী সা. প্রণীত মদীনা সনদের সাদৃশ্য আছে।
ঘ.
উক্ত সনদ তথা মদিনা সনদে পৃথিবীর সকল ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, নিম্নে উক্তিটি বিশ্লেষণ করা হলো :
মানবতার মুক্তির দূত মহানবী (সা.) নবুয়ত লাভের পর মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করলে কুরাইশরা তাঁর উপর অত্যাচার চালানো শুরু করে। অত্যাচার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেলে আল্লাহর নির্দেশে মহানবী মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় শোচনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা দেখে তিনি মদিনার সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের সমন্বয় মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। মদীনা সনদের মধ্য দিয়ে মদিনায় বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে চলমান হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-কলহ ভুলে গিয়ে তারা বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। এই সনদে মহানবী সকল মানুষের সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। যার ফলে দুর্বলদের উপর সবলদের অত্যাচার, অসহায়দের নিপীড়ন সহ ক্ষমতাসিলদের অন্যায় কার্যক্রমগুলো রুখে যায়। যার মাধ্যমে সকলের অধিকার অধিকার নিশ্চিত হয়। এছাড়াও এই সনদে মহানবী সকল ধরনের মানুষকে সমান অধিকার নিশ্চিত করেন। যার ফলে সকল ধরনের মানুষই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারেন।
এছাড়াও এই সনদ অনুসারে স্বাক্ষরকারী সভায় যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকার নিশ্চয়তা দেয়। যার ফলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং ধীরে ধীরে মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এরই মধ্যে দিয়ে মদিনায় শান্তি ও সুশৃংখল একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। যার ফলে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভাতৃত্বেবোধ এবং সম্প্রতির বন্ধন সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে একটি রাজনৈতিক ঐক্য সম্বলিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। এছাড়াও মহানবী মদিনায় গোত্র ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘোষণা করে এক আল্লাহ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামের শাসনতন্ত্র কায়েম করেন। যেহেতু মদিনা সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে মহানবী সকল মানুষের অধিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছেন। সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছেন এবং সবার মধ্যে সকল হানাহানি বিরত রেখে একটি সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করেছেন, তাই বলা যায় "মদিনা সনদে পৃথিবীর সকল ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে" উক্তিটি যথার্থ