ক.
'হিজরত' শব্দের অর্থ দেশত্যাগ, প্রস্থান বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া।
খ.
হিজরত এবং দেশত্যাগের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে।
শাব্দিকভাবে, হিজরত ও দেশত্যাগ একই অর্থ ধারণ করে। উভয়ের আভিধানিক অর্থ এক দেশ বা একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া। কিন্তু উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে দুটি ভিন্ন বিষয়। দেশত্যাগ যে কোনো বৈষয়িক বা পার্থিব উদ্দেশ্য সাধনে হতে পারে। কিন্তু 'হিজরত' শব্দটির সাথে ইসলাম প্রচার বা প্রসারের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। রাসুল (স) ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে বিরোধীদের চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বর্তমান সময়েও কেউ যদি অনুরূপ পরিস্থিতিতে বা উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তবে তা হিজরত বলে গণ্য হবে।
গ.
উদ্দীপকের ঘটনার অনুরূপ রণকৌশল মহানবি (স) খন্দকের যুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন ।
ইসলামের সূচনালগ্নে যে কয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল খন্দকের যুদ্ধ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত এ যুদ্ধে মহানবি (স) এক অভিনব কৌশলের মাধ্যমে মদিনা আক্রমণকারী কুরাইশদের মোকাবিলা করেন। তিনি পারসিক সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শক্রমে মদিনার চারপাশে খন্দক (পরিখা বা খাল) কেটে কুরাইশদের প্রতিরোধ করেন । তাই ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধ ‘খন্দকের যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে মূলত কৌশলের মাধ্যমেই মুসলমানরা কুরাইশদের পরাজিত করেছিল । উদ্দীপকের ঘটনায় এরকম কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যায় ।
উদ্দীপকের বর্ণনানুযায়ী, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশেদদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের গ্রামকে পাক সেনার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য গ্রামে প্রবেশের একমাত্র রাস্তাটি কেটে দিয়েছিল, যাতে পাকিস্তানি সেনারা সহজে গ্রামে ঢুকতে না পারে। মুক্তিযোদ্ধারা এ রণকৌশলের মাধ্যমে শত্রুদের গতিরোধ করতে সক্ষম হয়। অনুরূপ ঘটনা খন্দকের যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ কুরাইশ, ইহুদি ও বেদুইনদের সর্বাধিনায়ক আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কার মুশরিকরা মদিনা আক্রমণ করে। তাদের প্রতিহত করতে মুহাম্মদ (স) তিন হাজার মুজাহিদের এক বাহিনী মদিনার চারপাশে খননকৃত পরিখার পাহারায় নিযুক্ত করেন। পরিখা পেরিয়ে হামলা করতে ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা ২৭ দিন পর্যন্ত মদিনা অবরোধ করে রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন অবস্থান করতে হওয়ায় তাদের বাহিনীতে খাদ্য ও পানীয়ের অভাব দেখা দেয়। এছাড়া মরুঝড়ে তাঁবু উড়ে যায়। তাই কুরাইশরা বাধ্য হয়ে মক্কায় ফিরে যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাশেদদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে খন্দকের যুদ্ধে রাসুল (স)-এর প্রয়োগ করা কৌশলেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
ঘ.
খন্দকের যুদ্ধে মহানবি (স)-এর গৃহীত রণকৌশল অর্থাৎ পরিখা (খাল) খনন যুদ্ধ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ কুরাইশ, ইহুদি ও বেদুইনদের সম্মিলিত বাহিনী মদিনাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়। উহুদ যুদ্ধের বিজয়ী সেনাপতি আবু সুফিয়ান দশ হাজার সৈন্যের এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন । তাদের মোকাবিলা করার জন্য হযরত মুহাম্মদ (স) মাত্র ৩,০০০ সৈন্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন । যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণের জন্য মহানবি (স) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। বৈঠকে সালমান ফারসির পরামর্শক্রমে মদিনা নগরীর অরক্ষিত স্থানগুলোতে গভীর পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । মহানবি (স) নিজেও ঐ খনন কাজে অংশ নেন ।
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ মক্কার যৌথবাহিনী মদিনায় হামলা চালায়। কিন্তু মহানবি (স) এর অভিনব আত্মরক্ষার কৌশল দেখে তারা বিস্মিত হয় । অনেক চেষ্টা করেও কুরাইশরা পরিখা পার হয়ে মদিনায় প্রবেশ করতে পারেনি। তাই তারা ২৭ দিন মদিনা অবরোধ করে রাখে। এর মধ্যে সম্মিলিত বাহিনী খাদ্যাভাব, ঝড়-বৃষ্টি, হিমেল হাওয়া ইত্যাদি কারণে প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বাধ্য হয়ে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে মক্কায় ফিরে যায়। শুধু পরিখা খননের এই কৌশলের ফলেই শক্তিশালী শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে মুসলমানদের জানমাল রক্ষা পায় এবং তারা মদিনাকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। এটি ছিল মুসলমানদের একটি বড় বিজয়। বিশেষ করে সমর শক্তিতে পিছিয়ে থাকা পক্ষের জয়ী হতে হলে এ ধরনের কৌশলের বিকল্প নেই। উদ্দীপকে এরকম ঘটনাই দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশেদদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রামে প্রবেশের রাস্তাটি কেটে ফেলে। ফলে হানাদার বাহিনী ঐ গ্রামে ঢুকতে ব্যর্থ হয় । ফলে তাদের গ্রাম রক্ষা পায় ।
পরিশেষে বলা যায়, যুদ্ধের সময় পরিখা বা খাল কেটে শত্রু বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানো একটি অভিনব কৌশল। খন্দকের যুদ্ধে এ কৌশল প্রয়োগ করে রাসুল (স) জয়লাভ করেন। যুদ্ধে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ কৌশল গ্রহণ জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।