ক.
মহানবি (স) মক্কার অদূরে হেরা পর্বতের গুহায় নবুয়ত লাভ করেন।
খ.
মক্কা বিজয়ের সময়ে মহানবি (স) কোনো প্রকার রক্তপাত না ঘটিয়ে মক্কাবাসীকে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করেছিলেন বলে এ বিজয়কে রক্তপাতহীন বিজয় বলা হয়।
মহানবি (স) ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয় করেন। এ সময় তিনি অতীতের সব অপমান ও অন্যায় ভুলে গিয়ে মক্কাবাসীর প্রতি সর্বজনীন ক্ষমা ঘোষণা করেন। এভাবে রচিত হয় পৃথিবীর ইতিহাসে রক্তপাতহীন এক ঐতিহাসিক বিজয়। আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার ও নেপোলিয়ানের দেশজয় ছিল নিরীহ জনসাধারণের রক্তপাতের ইতিহাস। কিন্তু মহানবি (স)-এর মক্কা বিজয় ছিল রক্তপাতহীন এক মহাবিজয়।
গ.
উদ্দীপকের ভার্সাই সন্ধির সাথে আমার পঠিত হুদায়বিয়ার সন্ধির সাদৃশ্য রয়েছে।
হিজরতের পর দীর্ঘ ছয় বছর মহানবি (স) ও তাঁর অনুসারীরা মদিনায় অবস্থান করেন। এ সময় তারা জন্মভূমি মক্কা দর্শন ও হজ পালন করতে পারেননি। তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুসারে জিলকদ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। এজন্য মহানবি (স) তাঁর ১৪০০ সাহাবি সাথে নিয়ে ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসের ২৫ তারিখে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে পথে কুরাইশদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন এবং একটি চুক্তি করেন যা হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। উদ্দীপকেও এরূপ ঘটনা পরিলক্ষিত হয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত হয়েছে যে, ১৯১৯ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে মিত্রশক্তি ও জার্মানির মধ্যে একটি সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এ সন্ধিতে এমন কতগুলো শর্ত আরোপ করা হয়, যা জার্মানির জন্য অসম ও অবমাননাকর ছিল। তারপরও জার্মানি শান্তির জন্য সকল শর্ত মেনে নেয়। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বাক্ষরিত হুদায়বিয়ার সন্ধিতেও এরূপ চিত্র লক্ষ করা যায়। হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্তে বলা হয়- কোনো কুরাইশ মক্কা ছেড়ে মদিনায় গেলে মুসলমানরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু কোনো মুসলমান মদিনা থেকে মক্কায় এলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না। আরেকটি শর্তে বলা হয়, মক্কার কোনো নাবালক তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মুসলমানদের দলে যোগ দিলে তাকে ফেরত দিতে হবে। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে এমন অনেক শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, যা আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য ছিল অবমাননাকর এবং অসম। সুতরাং বলা যায়, ভার্সাই সন্ধির সাথে আমার পঠিত মক্কার কুরাইশ ও মদিনার মুসলমানদের মধ্যে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধির সাদৃশ্য রয়েছে।
ঘ.
হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছিল বলে পবিত্র কুরআনে একে মহাবিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মহানবি (স)-এর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো হুদায়বিয়ার সন্ধি। এটি ইসলাম ও বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে এ সন্ধির মাধ্যমে। হযরত আবু বকর (রা)-এর মতে, হুদায়বিয়ার সন্ধির মতো জয় মুসলমানদের আর কখনও হয়নি।
হুদায়বিয়ার সন্ধি মুসলমানদের জন্য শ্রেষ্ঠ বিজয়। আপাতদৃষ্টিতে এ সন্ধিপত্র কুরাইশদের অনুকূলে সম্পাদিত হয়েছে বলেই মনে হয়। কিন্তু দূরদৃষ্টিতে বিচার করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এটি সর্বতোভাবে মুসলিম স্বার্থের অনুকূলে হয়েছিল। এ চুক্তিটি মুসলমানদেরকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক মর্যাদা দান করে। এর মাধ্যমে মুসলমানরা যে একটি স্বতন্ত্র শক্তি তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ চুক্তির মাধ্যমেই কুরাইশরা মহানবি (স)-কে একজন মহান নেতা এবং মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে মেনে নেয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে দশ বছর যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হওয়ায় মুসলমানগণ নিশ্চিন্তভাবে বসবাস করার সুযোগ লাভ করে। এ সন্ধির ফলে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের পথ দিন দিন প্রশস্ত হতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলামের শ্রেষ্ঠ বীর ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পায়। হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলেই মুসলমানরা বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় (৬৩০) করে। অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুফল বয়ে আনে।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, হুদায়বিয়ার সন্ধি ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। এ সন্ধি মহানবি (স)-এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতির মাধ্যমে ইসলামের শক্তি সুসংহত রূপলাভকরে। এসব কারণেই মহান আল্লাহ আল কুরআনে একে মহাবিজয় বলে ঘোষণা করেছেন।