ক.
যে সব শব্দ ব্যবহার করে একটি পদের সংজ্ঞা দেওয়া হয় তাকে সংজ্ঞার্থ পদ বলে।
খ.
সংজ্ঞায় জটিল বা দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করলে দুর্বোধ্য সংজ্ঞাজনিত অনুপপত্তি ঘটে।
যৌক্তিক সংজ্ঞার দ্বিতীয় নিয়ম অনুসারে- 'যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হবে, সংজ্ঞাটি সেই পদ অপেক্ষা স্পষ্টতর হতে হবে, কোনো দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।' এ নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো পদের সংজ্ঞায় জটিল বা দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করলে দুর্বোধ্য সংজ্ঞাজনিত. অনুপপত্তি সংঘটিত হয়। যেমন- বক হলো শ্বেত-শুভ্র দীর্ঘ-গ্রীব বিশিষ্ট সুশ্রী বিহঙ্গ। এটি একটি দুর্বোধ্য সংজ্ঞার দৃষ্টান্ত। কেননা এতে দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করে বকের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গ.
রাফিন ও ইমনের কথায় সংজ্ঞার অতিব্যাপক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ও আপতিক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।
কোনো পদের সংজ্ঞায় যদি দেখা যায় যে, সংজ্ঞার্থ পদ সংজ্ঞেয় পদের ব্যক্ত্যর্থকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাহলে সংজ্ঞাটি ত্রুটিপূর্ণ অতিব্যাপক সংজ্ঞা বলে বিবেচিত হবে। যেমন- 'মানুষ হয় মেরুদণ্ডী প্রাণী'। এই সংজ্ঞায় 'মানুষকে মেরুদণ্ডী প্রাণী: বলায় অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীও মানুষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের ব্যক্ত্যর্থ বেড়ে যাচ্ছে। তাই এটি একটি অতিব্যাপক সংজ্ঞা। উদ্দীপকের রাফিনও তার বন্ধু ইমন মানুষ পদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলে, 'মানুষ হয় এমন প্রাণী যারা খাবার খায় ও পানি পান করে'। এখানে মানুষকে এমন সকল প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা খাবার খায় ও পানি পান করে। তাই এখানে অতিব্যাপক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।
আবার, একটি সংজ্ঞায় অতিরিক্ত গুণটুকু যদি পদের অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ হয়, তাহলে সংজ্ঞাটি ভ্রান্ত হবে। এরূপ ভ্রান্ত সংজ্ঞার নাম আপতিক বা অবান্তর সংজ্ঞা। যেমন- মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন দ্বিপদ জীব। এখানে অতিরিক্ত 'দ্বিপদ' গুণটি মানুষ পদের জাত্যর্থ না হয়ে অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ হওয়ায় আপতিক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে। উদ্দীপকের শুভ বলে, 'মানুষ হয় দুই হাত বিশিষ্ট প্রাণী'। এখানে 'দুই হাত, বিশিষ্ট' গুণটি মানুষ পদের জাতিগত অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ। তাই সংজ্ঞাটিতে আপতিক বা অবান্তর সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।
ঘ.
হিরণের কথাটি 'সব পদেরই সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়' দ্বারা যৌক্তিক সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করা হয়েছে। তাই তার বক্তব্যটি যথার্থ।
যৌক্তিক সংজ্ঞার প্রধান উদ্দেশ্য হলো অপরিহার্য গুণ হিসেবে পদের জাত্যর্থকে প্রকাশ করা। অর্থাৎ আসন্নতম জাতি এবং বিভেদক লক্ষণ উল্লেখ করে যৌক্তিক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়। কিন্তু এমন অনেক পদ রয়েছে, যাদের আসন্নতম জাতি কিংবা বিভেদক লক্ষণ নেই। সেসব পদের ক্ষেত্রে যৌক্তিক সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়।
বৃহত্তম জাতি ব্যক্ত্যর্থের দিক থেকে সবচেয়ে বড়। একে অপর কোনো বড় জাতির অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। অর্থাৎ এর কোনো আসন্নতম জাতি নেই। তাই এর সংজ্ঞা দান সম্ভব নয়। আবার, নামবাচক পদগুলো অর্থহীন চিহ্নমাত্র। এদের মধ্যে কোনো জাত্যর্থ নেই। তাই এদের সংজ্ঞা দানও সম্ভব নয়। কোনো একক ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে অগণিত গুণ বর্তমান থাকে। তাই এদের সবগুলোকে সংজ্ঞায় উল্লেখ করা যায় না। তাই এদেরও সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব' নয়। এছাড়াও বিশিষ্ট গুণবাচক পদ যেমন- সততা, সত্যবাদিতা, সাদাত্ব, মিষ্টত্ব ইত্যাদির সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। মনের মৌলিক গুণসমূহ যেমন- সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিরহ ইত্যাদির সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। কতকগুলো অপরিহার্য ধারণার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। যেমন- দেশ, কাল, আত্মা, ঈশ্বর ইত্যাদি।
আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, উদ্দীপকের হিরণের 'সব পদেরই সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়' কথাটি যৌক্তিক।