ক. রাষ্ট্রীয় জীবনে মহান আল্লাহর খলিফারূপে তাঁরই সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে তাঁর প্রবর্তিত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করে রাসুল (সা.)-এর প্রদর্শিত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নাম খেলাফত।
খ. ইসলামি খেলাফতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি আল্লাহর আদেশ- নিষেধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মুমিনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন। খেলাফত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কল্যাণমুখী শাসন কাঠামো দ্বারা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা খেলাফতের কাজ। অনৈসলামিক মূল্যবোধ থেকে জনগণের সুরক্ষাও এর দায়িত্ব।
গ. ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও মজলিস-ই-শূরার সদস্য হতে হলে কতিপয় আইনগত যোগ্যতা ও চারিত্রিক গুণের অধিকারী হতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা মজলিস-ই-শূরার সদস্যপদের জন্য যেসব আইনগত যোগ্যতার অধিকারী হতে তাহলো- ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং মজলিস-উশ-শূরার সদস্যকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। কোনো অমুসলিম ইসলামি রাষ্ট্রের এ পদের উপযুক্ত নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর তোমাদের মধ্য হতে (নির্বাচিত) অমির বা নেতার।" (সূরা আন-নিসা: ৫৯) রাষ্ট্রপ্রধান ও মজলিস-ই-শূরার সদস্যগণকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে। কোনো মহিলা ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা মজলিস-উশ-শূরার সদস্য হতে পারবে না। মহানবি (সা.) বলেন, "যে জাতি কোনো মহিলাকে তাদের নেতৃত্বে বরণ করে, সে জাতি সফলতা অর্জন করতে পারে না।" (বুখারি, হাদিস: ৪৪২৫) উক্ত পদের জন্য অবশ্যই প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ রাষ্ট্রপ্রধান বা মজলিস-ই-শূরার সদস্য হতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আল্লাহ-তাআলা যে ধনসম্পদকে তোমাদের অস্তিত্ব রক্ষার উপায় বানিয়েছেন, তা তোমরা অধম অযোগ্য মূর্খদের হাতে তুলে দিও না।" (সূরা আন-নিসা: ৫) ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং শূরার সদস্য হতে হলে অবশ্যই রাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। নাগরিকত্বহীন ব্যক্তি এ পদের উপযুক্ত নন। ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও শূরার সদস্য হতে হলে আইনগত গুণাবলির সাথে কতিপয় নৈতিক ও চারিত্রিক গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। তা হলো- রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অবশ্যই সর্বোত্তম তাকওয়ার অধিকারী, আল্লাহ ভীরু ও পরহেযগার লোক হতে হবে।তা হলো- রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অবশ্যই সর্বোত্তম তাকওয়ার অধিকারী, আল্লাহ ভীরু ও পরহেযগার লোক হতে হবে। আল্লাহ বলেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পরহেজগার ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট সম্মানিত।" (সূরা আল-হুজুরাত ১৩) রাষ্ট্রপ্রধান ও শূরার সদস্যপদ লাভের অধিকারী তারাই, যারা সততার অধিকারী, আমানতদার ও জনগণের আস্থাভাজন হন। আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা শূরার সদস্যবৃন্দ যেহেতু সমাজের শ্রেষ্ঠ নৈতিক আদর্শের অধিকারী বলে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন, তাই কেউ এখানে পদপ্রার্থী বা পদলোভী হতে পারবে না। তাদের খোলাফায়ে রাশেদিনের মতো আদর্শ চরিত্র ও গুণাবলির অধিকারী হতে হবে।
ঘ. রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ করা। আল্লাহর খেলাফতের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে- দ্বীন ইসলামকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা, দ্বীনকে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত করা, দ্বীনের মর্যাদা, ঐতিহ্য-আদর্শ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। আর এ কাজের জন্য প্রধান দায়িত্বশীল হচ্ছেন খলিফা।
রাষ্ট্রপ্রধানের আর একটি কর্তব্য হচ্ছে বিবাদমান পক্ষসমূহের ওপর আল্লাহর আইন কার্যকর করা। ঝগড়া-বিবাদ ও যাবতীয় সমস্যার সমাধান ও ফয়সালায় ইসলামি আইন অনুসরণ করা। ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকদের জীবনকে সকল প্রকারের ভয়ভীতি ও বিপদ-আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে স্বাধীন-নির্বিঘ্নে জীবনযাপনের নির্ভরযোগ্য সুযোগ দেওয়া খেলাফত ব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত হারাম ও অবৈধ কাজ যাতে কেউ করতে না পারে, কোনো নাগরিকই যেন স্বীয় ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। বৈদেশিক ও বিজাতীয় আক্রমণ ও আগ্রাসন থেকে দেশকে, দেশের জনগণকে এবং তাদের জীবন-সম্পদ, মান-ইজ্জত রক্ষা করা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন ও সামর্থ্য সংগ্রহ করা রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম কর্তব্য। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক রাষ্ট্রের কর, খাজনা ও অন্যান্য সরকারি পাওনা সঠিকরূপে নির্ধারণ করা ও তা আদায় করার ব্যবস্থা করাও রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম দায়িত্ব। রাষ্ট্রের বাইতুল মাল সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রপ্রধানের আর একটি দায়িত্ব। বাইতুল মাল থেকে যাকে যা দেওয়া হবে তার পরিমাণ নির্ধারণ এবং যথাযথভাবে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা, অপচয় না করা ইত্যাদি খেলাফত প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। দায়িত্বশীল নির্বাহী কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, তাদের কাজে সুযোগ সৃষ্টি করা, তাদের নিকট থেকে কাজ বুঝে নেওয়া, তাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা খলিফার দায়িত্ব ও কর্তব্য। পথভ্রষ্ট ও বিপদগামীদেরকে ইসলামের সুমহান পথে ফিরে আনার পদক্ষেপ গ্রহণও খলিফার দায়িত্ব। অর্থাৎ দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের পুরো দায়-দায়িত্বটাই খেলাফত ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত। সমস্ত জাতীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হওয়া, পরিস্থিতির অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও তদনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, যেন সার্বিকভাবে গোটা উম্মাহ রক্ষা পায় এবং মিল্লাত সংরক্ষিত থাকে।
উদ্দীপকেও বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলামি খেলাফতের স্বর্ণযুগ ছিল খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ। তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে ছিলেন সদা সচেতন। বস্তুত ইসলামি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংরক্ষণ, নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্রের কল্যাণ, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনা সর্বোপরি আল্লাহর বিধান জারি ও সংরক্ষণ করাই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য।