ক.
মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রকর্তৃক প্রণীত বিধিবিধানই হলো আইন।
খ.
সমাজে বিদ্যমান কুপ্রথা দূর করা সামাজিক আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য। সামাজিকভাবে এমন সব কুসংস্কার বা কুপ্রথার প্রচলন দেখা যায়, যা সামগ্রিকভাবে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এ প্রতিবন্ধকতা দূর করার লক্ষ্যে সামাজিক আইন প্রণয়ন করা হয়। যেমন— হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রচলন ও সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
গ.
উদ্দীপকে মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ সালের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুসলমান নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা প্রদানে প্রণীত হয়েছে মুসলিম পারিবারিক আইন। এ আইনটি বিশেষ করে মুসলিম সমাজে বহুবিবাহ, তালাক, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি পারিবারিক বিষয়াদি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়। দীর্ঘদিন মুসলিম পারিবারিক ক্ষেত্রে আইনগত কাঠামোর শূন্যতা অনুভব হচ্ছিল। বহুবিবাহ, তালাক, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার প্রভৃতি বিষয়ে দিকনির্দেশক আইনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ফলে বিবাহ ও পারিবারিক আইন কমিশনের কতিপয় সুপারিশ কার্যকারীকরণের লক্ষ্যে ১৮৬১ সালে এ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়। উদ্দীপকের ছকে বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ, সালিসি কাউন্সিল গঠন, দেনমোহর, তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদ প্রভৃতি বিষয়গুলো ওঠে এসেছে; যা এ আইনের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।
ঘ.
ছকে উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে আরও ধারা রয়েছে, যা নিচে আলোচনা করা হলো- বিবাহের বয়স : এ আইন অনুসারে বিবাহের ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স ন্যূনতম ২১ বছর এবং মেয়েদের ন্যূনতম ১৮ বছর হতে হবে। মেয়ের মতামতের প্রাধান্য: এ আইনে পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিবাহ : এ আইনে প্রথম স্ত্রী বেঁচে থাকতে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না। তবে প্রথম স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্বামী ও স্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সালিসি পরিষদের অনুমতিক্রমে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে।
উত্তরাধিকার : এ আইন অনুসারে কোনো পরিবারে দাদা জীবিত থাকা অবস্থায় বাবা মারা গেলে দাদার সম্পত্তি থেকে নাতি-নাতনিদের বঞ্চিত করা যাবে না। তারা দাদার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকারী।
তালাক ব্যতীত অন্য কোনোভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ : স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যর্থতা স্বামীর ইচ্ছাকৃত না হলেও তা ব্যর্থতা বলে গণ্য করা হবে। এছাড়া দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য, বেকারত্ব, কারাবণ বা অন্য কোনো কারণবশত ব্যর্থতাও আইনের দৃষ্টিতে ব্যর্থতা বলে গণ্য হবে এবং স্ত্রী তালাক গ্রহণের অধিকারিণী হবে। তাছাড়া স্ত্রীর দেনমোহর দাবি করা মাত্র না পেলে সে স্বামীর নিকট থেকে পৃথক থাকতে পারে। স্বামী যদি ২ বছর যাবত স্ত্রীর ভরণপোষণ না দেয় তাহলেও স্ত্রী তালাক দিতে পারবে।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন নারীকল্যাণমূলক একটি সামাজিক আইন। নারীর স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণের লক্ষ্যে এ আইনটি প্রণীত হয়, যার প্রত্যেকটি ধারায় নারীর অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুস্পষ্ট।