ক.
একুশ নিয়ে প্রথম কবিতার নাম হলো— 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি'।
খ.
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা প্রথম সংগঠন হলো ‘তমদ্দুন মজলিশ'।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নুরুল হক ভুঁইয়া ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ” গঠন করেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' প্রকাশিত হয়। মূলত তমদ্দুন মজলিশই ছিল ভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা প্রথম সংগঠন ।
গ.
উদ্দীপকের ছবি আমার পাঠ্যবইয়ের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে ৷
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির অধিকার হরণের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। পুরো পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬.৪০ শতাংশের মুখের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৩.২৭% মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয় শাসকগোষ্ঠী। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের বাঙালি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় । সারাদেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবদুল জব্বার প্রমুখ শহিদ হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহিদদের নিহত হওয়ার স্থানে ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদ মিনার নির্মাণ করে। কিন্তু পুলিশ শহিদ মিনারটি ভেঙে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বর্তমান শহিদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। এই শহিদ মিনার বাঙালি জাতিকে মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় ।
উদ্দীপকের চিত্রটি হলো ঢাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার । এই শহিদ মিনার সৃষ্টির পেছনে রয়েছে বাঙালি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য 'আত্মত্যাগের ইতিহাস। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্রটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ঘ.
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে উক্ত আন্দোলন তথা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ আন্দোলন বাঙালিদের তাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ভাষা-সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা সাংস্কৃতিক ছাড়াও অন্যান্য অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠে। ফলে তারা
পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দাবি আদায়ের তাগিদ বোধ করে। বস্তুত এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলার স্বাধিকারের চেতনা দানা বাঁধতে থাকে। এ চেতনাই পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে সুগম করে। বাঙালিরা নিজেদের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি সৃষ্ট হতাশা থেকে তারা মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ব্যালট বিপ্লব ঘটায়। তারা বাঙালিদের বিভিন্ন প্রাণের দাবি তুলে ধরা যুক্তফ্রন্টকে বিপুলভাবে বিজয়ী করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা এর পর ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৬টি দাবির অন্যতম ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এর পথ বেয়েই আসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানি শাসকরা নির্বাচনে বাঙালিদের প্রধান দল আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় । উল্টো চালায় গণহত্যা। ফলে অনিবার্য হয়ে হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তান পরিণত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশে।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল। আর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র তারই চূড়ান্ত পরিণতি।