ক.
একুশ নিয়ে প্রথম কবিতার নাম 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি'।
খ.
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা প্রথম সংগঠন হলো 'তমদ্দুন মজলিস'।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর 'তমদ্দুন মজলিস' গঠন করেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' প্রকাশিত হয়। মূলত তমদ্দুন মজলিসই ছিল ভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা প্রথম সংগঠন।
গ.
উদ্দীপকের ছবি আমার পাঠ্যবইয়ের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ঘটনাকে ইঙ্গিত করে।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার ওপর নানা বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। প্রথমেই তারা আঘাত হানে বাঙালির ভাষার ওপর। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের মাতৃভাষা বাংলা। তাই সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' আন্দোলন শুরু হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬.৪০ শতাংশের মুখের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মাত্র ৩.২৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ভাষা উর্দুকে তারা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালি ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতের রক্তের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিকশিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা। উদ্দীপকের ছবিতে প্রদর্শিত স্থাপনাটি ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই নির্মিত হয়েছে। তাই বলা যায় যে, এ ছবির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ঘ.
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে উক্ত আন্দোলন তথা ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। জাতিসত্তার মৌলিক উপাদান রক্ষায় এমন ব্যাপক, তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলনের নজির ইতিহাসে আর খুঁজে 'পাওয়া যায় না। এ আন্দোলনের উদ্দীপনায়ই বাংলার পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো পরিচালিত হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সর্বপ্রথম নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলায় স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনার আত্মপ্রকাশ ঘটে। আর এ চেতনাই পরবর্তীকালে প্রতিটি গণআন্দোলনে প্রেরণা যোগায় এবং মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে সুগম করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালি জাতি ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে শাসক দল মুসলিম লীগের বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধ করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ পূর্ব বাংলার মানুষ এরপর ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্বাধিকারের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ফলে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালির মধ্যে যে অদম্য জাতীয়তাবোধ তৈরি হয় তা পরবর্তী আন্দোলনগুলো পরিচালনায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।