ক.
ফরাসি বিপ্লবের পর পুরুষেরা ব্রীচেস পরা ছেড়ে দেয়।
খ.
বাস্তিল দুর্গ পতনকে বলা হয় ফরাসি বিপ্লবের প্রথম অধ্যায়। কারণ এ দুর্গের পতনের ফলে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতনের সূচনা হয়। জনতার রুদ্ররোষ এবং হিংস্র মনোভাব দেখে রাজা এবং সভাসদরা আতঙ্কিত হয়। রাজা জাতীয় সভাকে বলপূর্বক ভেঙে দেওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করেন। প্যারিসের সংবাদে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবের শিখা প্রজ্বলিত হয়। গুডউনের মতে, “বাস্তিলের পতনের ন্যায় বিপ্লবের আর কোনো একক ঘটনার এত বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী ফল ছিল না।”
গ.
উদ্দীপকের গ্রামের ঘটনার সাথে আমার পাঠ্যপুস্তকের ফরাসি বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে রাজাকে ভার্সাই প্রাসাদ থেকে প্যারিসে ফিরিয়ে আনার ঘটনার মিল পাওয়া যায়।
ফ্রান্সের তৃতীয় সম্প্রদায় যখন অধিকার আদায়ের নেশায় মত্ত তখন প্যারিস নগরীর অধিবাসীদের মধ্যেও এক বিপ্লবী চেতনা জাগ্রত হয়। এ চেতনার উজ্জীবিত হয়ে বিপ্লবীরা বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটায়। এ পতনের ফলে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতনের সূচনা হয়। রাজা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং জাতীয় সভাকে বলপূর্বক ভেঙে দেওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করেন। কিন্তু রাজার সাথে জাতীয় সভার মতের অমিল হলে রাজা আবার বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। রাজা সৈন্যদের ভার্সাই নগরীতে ডেকে পাঠান। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জনতা আবার ক্ষিপ্ত হয়। প্যারিসে খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং রুটির দাম বেড়ে যায়। বিপ্লবী নেতারা ভাসমান জনতাকে উপদেশ দেন যে রাজাকে ভার্সাই প্রাসাদ থেকে প্যারিসে আনতে পারলে রুটির দাম কমে যাবে। ফলে কয়েক হাজার নারী এবং অনেক পুরুষ ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর 'রুটি চাই' স্লোগান দিয়ে ভার্সাই নগরীর দিকে যাত্রা করে। তারা রাজা, রানি এবং তাদের বালক পুত্রকে ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে প্যারিসে নিয়ে আসে। অতঃপর রাজা বিপ্লবী নেতাদের অধীনে থাকতে বাধ্য হন। জাতীয় পরিষদ প্যারিসে স্থানান্তর করা হয় এবং জনতার দ্বারা প্রভাবিত হয়। উদ্দীপর্কেও তেমনি দেখা যায়, ধনাঢ্য ব্যক্তি সেলিম সাহেবের চরপাড়া গ্রামের অর্ধেক জমিই তার। হঠাৎ তিনি শহরে চলে এলে গ্রামের মানুষের খুবই অসুবিধা হলে নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে সেলিম সাহেবকে গ্রামে ফিরিয়ে আনার জন্য শহরে চলে যায়। এ-ঘটনার পর গ্রামে আবার চাঞ্চল্য ফিরে আসে। অর্থাৎ এ দ্বারা পাঠ্যপুস্তকের রাজাকে প্যারিসে আনয়নের সাথে হুবহু মিলে যায়।
ঘ.
হ্যাঁ, আমি মনে করি, এ ধরনের আন্দোলনের ফলে ফ্রান্সের জনগণের মাধ্যে শান্তি ফিরে আসে।
মানবজাতির ইতিহাসে রুশ বিপ্লব ছাড়া ফরাসি বিপ্লবের মতো এতো ব্যাপক ও গভীর বিপ্লব আর ঘটেনি। এ বিপ্লব দানবীর কাঁটার মতো ফ্রান্সের পুরাতন জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে বিদায় করে দেয় এবং নতুন সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। যেমন ফ্রান্সে মধ্যযুগ থেকে সামন্ততান্ত্রিক এবং অভিজাত সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এ অসাম্যের ধ্বংস করে এবং একই বছর ১৩ আগস্ট ফরাসি বিধানসভা সকল প্রকার সামন্ত কর ও সামন্ত স্বত্ববিলোপ সাধন করে। ফলে সামাজিক সাম্য স্থাপিত হয়। সামন্তপ্রথা বিলোপের ফলে ফ্রান্সে স্বাধীন কৃষকগণ সামন্তদের বাজেয়াপ্ত ভূমি ক্রয় করে ধনী হয়। তারা ভূমিদাস শ্রেণি হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের সুযোগ পায়। তাছাড়া শহরের সর্বহারা দিনমজুরদের সাঁকুলেৎ বলা হতো। ফরাসি বিপ্লবের ফলে এ দিনমজুরদের তেমন কোনো স্থায়ী উপকার হয়নি। মুক্ত অর্থনীতির ফলে ক্ষুদ্র শিল্প ও ছোট দোকানদারদের উপকার হলেও শহরের সাঁকুলেরা উৎসাহিত হয়। ফরাসি বিপ্লব আসলে ছিল বুর্জোয়া বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবে সমাজে যে নতুন ফসল ফলে তা বুর্জোয়া শ্রেণিই ঘরে তোলে। পুঁজিবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি আবার সে সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার স্থাপন করে। জাতীয় সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয়, যুদ্ধের ঠিকাদারি ও ফটকাবাজিতে তাদের হাতে অনেক অর্থ আসে। ফরাসি বিপ্লবের ফলে বংশানুক্রমিক ফরাসি রাজতন্ত্রের আদর্শের ভিত্তি চিরতরে বিনষ্ট হয়। ডাইরেক্টরি আমলে ভোটাধিকার সংকুচিত হলেও প্রজাতন্ত্রের আদর্শ চালু থাকে। কিন্তু নেপোলিয়ান বংশানুক্রমিক শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। বুরবোঁ রাজারাও রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। মোটকথা, ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে গণতন্ত্রের আদর্শ জয়লাভ করে। এছাড়াও ফরাসি বিপ্লবের ফলে নতুন পোশাকের প্রচলন হয়। পুরুষেরা ব্রিচেস পরা ছেড়ে ট্রাউজার ও কোট পরা শুরু করে। নারীরা কোমর ফোলানো মাটি ছাপানো স্কাট ছেড়ে আঁটসাঁট ছোট স্কার্ট পরতে আরম্ভ করে। পুরুষ মানুষেরা তিন রঙা পোশাক ও লাল টুপি পরতে শুরু করে।
উপরিউক্ত আলোচনায় শেষে বলা যায়, ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় এবং শান্তি ফিরে আসে।