ক.
বানালিতে হচ্ছে ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্সে প্রচলিত এক প্রকার পরোক্ষ কর।
খ.
সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো। তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ১৭১২ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশবে তিনি পিতামাতা হারান। এরপর তিনি প্যারিসে চলে যান। সেখানে গিয়ে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মতবাদ হচ্ছে সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এ গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেছেন ঈশ্বর রাজা বা রাষ্ট্র সৃষ্টি করেনি। বরং মানুষ একটি পরস্পর সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। এটিই তার বিখ্যাত সামাজিক চুক্তি মতবাদ।
গ.
উদ্দীপকে '?' (প্রশ্নবোধক) চিহ্নিত স্থানে ফরাসি বিপ্লব ঘটনাটি গ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি।
ফরাসি বিপ্লব ছিল মূলত ইউরোপীয় ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ ও দখলের মধ্য দিয়ে জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থান জয়যুক্ত হয় এবং আজও এদিনটি বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে। ফরাসি বিপ্লবকে বলা হয় আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা। এ বিপ্লবের ফলে ফরাসি সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থার অবসান ঘটে। বিশেষ অধিকার প্রাপ্ত ও অব্যাহতি প্রাপ্ত সম্প্রদায়গুলোর বিশেষ অধিকার ও অব্যাহতি লোপ করে সামাজিক বৈষম্যের অবসান ও-সাম্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সামন্তপ্রথা বিলোপের ফলে কৃষকরা ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের সুযোগ লাভ করে। শোষণ ও বৈষম্যমূলক কর অবসানের ফলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আসে। রাজনৈতিক সংগঠন জিরোন্ডিস্ট, জ্যাকোবিন ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সৃষ্টি ফরাসি বিপ্লবেরই ফল। ফরাসি বিপ্লবের ফলে যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সাম্য, শোষণমুক্ত সমাজ, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি ধারণা গোটা ইউরোপ ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
তাই বলতে পারি, উদ্দীপকের '?' (প্রশ্নবোধক) স্থানে ঘটনাটি হবে ফরাসি বিপ্লব।
ঘ.
উক্ত বিপ্লব অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সূচনা করে। বিপ্লবের আগে ফ্রান্স : ছিল একটি সামন্ততান্ত্রিক দেশ। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তা পুঁজিবাদী ধারায় বিকশিত হতে থাকে। ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও 'ধর্মযাজক গোষ্ঠীর প্রভাব দুর্বল হতে থাকে। ফ্রান্স কার্যত একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে বিপ্লবের মাধ্যমে। ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করেছে, বিভিন্ন নামে ফ্রান্সে জাতীয় সংসদ গঠন করেছে, ফ্রান্সকে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে অবদান রেখেছে। এই বিপ্লব 'ফরাসি জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার সঞ্চার করেছে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটার সুযোগও এ বিপ্লবের ফলে শুরু হয়। জিরন্ডিন, জ্যাকোবিনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ফ্রান্সে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে।
ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের সমাজকেই নয়, গোটা ইউরোপকেও আলোড়িন করেছিল। 'গণতন্ত্র, যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সাম্য, শোষণমুক্তি, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি ধারণা ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহে বিস্তার লাভ করে। ফরাসি জাতি প্রতিবছর ১৪ জুলাইকে তাদের প্রধান জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এর মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের চেতনায় তারা উজ্জীবিত হওয়ার শপথ নতুন করে গ্রহণ করে তাকে। ফরাসি বিপ্লব এভাবেই ফরাসি জাতির কাছে মহান এক ঐতিহাসিক কালপর্ব হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পঠিত হয়। এই বিপ্লবের ইতিহাস পাঠে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলিত হয়ে, নিজ নিজ দেশের বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগ্রামের সাথে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে।
তাই উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলতে পারি, ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল ছিল ফ্রান্স ও ইউরোপের জন্য এক সুদূরপ্রসারী মাইলফলক।