ক.
বিবাহ-পরবর্তী বসবাসের ভিত্তিতে পরিবার তিন প্রকার।
খ.
লেভিরেট বিবাহ বলতে কোনো পুরুষের সাথে তার মৃত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর বিবাহকে বোঝায়। এ ধরনের বিবাহ বাংলাদেশের সমাজে কালেভদ্রে দেখা যায়। সাধারণত বিধবা মহিলাটির স্বামীর মৃত্যুর পর প্রাপ্য সম্পত্তির পরিমাণ বেশি হলে, কিংবা তার ছোট ছোট সন্তান- সন্ততি থাকলে, কখনোবা স্বামীর মৃত্যুর পর দুটি পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য ইত্যাকার নানা কারণে মৃত স্বামীর বিবাহযোগ্য ছোট ভাইয়ের সাথে তার বিবাহ দেওয়া হয়। এছাড়া এদেশের সমাজে সরোরেট বা শ্যলিকা বিবাহ তথা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার ছোট বোনকে বিবাহ করার প্রথাও লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে আত্মীয়তা বজায় রাখা, কখনোবা মৃত স্ত্রীর শিশু সন্তান থাকলে তার যত্ন ও লালন-পালনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবা হয়।
গ.
উদ্দীপকে মেহমানদের সাথে জলিল সাহেবের জ্ঞাতিসম্পর্ক। বিদ্যমান। জ্ঞাতি সম্পর্ক মানুষের সমাজকাঠামোর চাবিকাঠি। এর ওপর নির্ভর করে মানুষের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক এবং মিথস্ক্রিয়া। এ সম্পর্কের যথাযোগ্য সংজ্ঞা হলো- রক্ত, বিবাহ, কল্পনা, বন্ধুত্ব, দত্তক গ্রহণ ইত্যাদি বন্ধনসূত্রে আবদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যকার আত্মীয়তার সম্পর্কই জ্ঞাতি সম্পর্ক। আমরা উদ্দীপকে লক্ষ করি, জলিল সাহেব বড় ছেলের বিয়েতে ভাই-বোন, চাচা-চাচী, শ্বশুর ও শাশুড়ি, খালা-খালু, পাড়া-প্রতিবেশী, ধর্মের মেয়েসহ অনেক আপনজনকে দাওয়াত করেন। যা সুস্পষ্টতই জ্ঞাতি সম্পর্কের আওতাভুক্ত। বাংলাদেশে জ্ঞাতি সম্পর্কের ৪টি ধরন লক্ষ করা যায়। যথা- ১. জৈবিক বা রক্তসম্পর্কীয় জ্ঞাতি, সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলনের ফলে যে সন্তান জন্ম নেওয়ার মধ্য দিয়ে এ সম্পর্কে ভিত গড়ে ওঠে। বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-ফুফু এ ধরনের সম্পর্কগুলো জৈবিক সম্পর্কের মধ্যে পড়ে। ২. বৈবাহিক বন্ধনের ফলে যে সম্পর্ক গড়ে উঠে, যেমন শ্বশুর-শাশুড়ি, দেব-শ্যালক এ জাতীয় সম্পর্ক। ৩. কাল্পনিক সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্ক নেই, এরপরও আমরা রক্তের সম্পর্কের মতো আচরণ করি, এ ধরনের সম্পর্কই কাল্পনিক সম্পর্ক বলা হয়। ৪. প্রথাগত কন্ধন, পাড়া-প্রতিবেশীদের আমরা চাচা-চাচী, মামা-মামী ইত্যাদি বলে সম্বোধন করি, তা মূলত প্রথাগত বন্ধন। উদ্দীপকের জলিল সাহেবের দাওয়াতকৃত মেহমানদের বিশ্লেষণ করলে এ চার ধরনের জ্ঞাতি সম্পর্কই পাওয়া যায়। সুতরাং বলা যায় যে, উদ্দীপকের মেহমানদের সাথে জলিল সাহেবের জাতি সম্পর্ক বিদ্যমান।
ঘ.
আমাদের দেশে এ ধরনের সম্পর্কে তথা জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালিদের আবহমান কালের সমাজ ব্যবস্থায় জ্ঞাতি সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো জ্ঞাতি সম্পর্ক। এখানকার সমাজের ভিত্তিই গড়ে উঠেছে জ্ঞাতি সম্পর্কের ওপর।
আচার-অনুষ্ঠান, বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু এককথায় একজন মানুষের জীবনের সবকিছুই জ্ঞাতিসম্পর্ককে কেন্দ্র করে। আমরা উদ্দীপকে লক্ষ করি, জলিল সাহেবের বড় ছেলের বিয়ে সংগঠিত হয়েছে মূলত তার জ্ঞাতিসম্পর্কের লোকদের কেন্দ্র করে। এভাবে আমাদের পুরো সামাজিক কাঠামোতেই এ সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে। তাছাড়া আত্মীয় কুটুমদের প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি বাঙালিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আতিথেয়তা এ অঞ্চলের। মানুষের আবহমান কালের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। জ্ঞাতি সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই বাঙালিদের আবেগপ্রবণ জাতি বলা হয়। এখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে জ্ঞাতি সম্পর্কে জড়িয়ে আছে, যার ফলে একজনের দুঃখও অন্যজনকে ব্যথিত করে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে। এরূপ চিত্র পরিলক্ষিত হলেও শহুরে সমাজ এর অনেকটাই ব্যতিক্রম। তথাপি শহুরে সমাজে ও জ্ঞাতিসম্পর্কের কিছু প্রভাব এখনও বিদ্যমান।
মোদ্দাকথা হলো জ্ঞাতিসম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা একেবারেই কল্পনা করা যায় না। তাই বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে জ্ঞাতিসম্পর্কভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।