ক.
কোনো ব্যক্তিকে তার বর্তমান আবাসস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য করে এমন নেতিবাচক উপাদানগুলোকে পুশ ফ্যাক্টর বলে।
খ.
শহুরে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক মূলত আনুষ্ঠানিকতা ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বলে একে নৈর্ব্যক্তিক বলা হয়।
শহর জীবনে মানুষ অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে এবং এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। গ্রামীণ সমাজের মতো এখানে সবার সাথে সবার গভীর আবেগীয় বা প্রাথমিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। শহরের মানুষ সাধারণত তাদের পেশাগত বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে একে অপরের সংস্পর্শে আসে, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগের 'চেয়ে নিয়ম-কানুন ও আনুষ্ঠানিকতা বেশি প্রাধান্য পায়। ফলে প্রতিবেশীদের মধ্যেও অনেক সময় জানাশোনা থাকে না, যা সম্পর্ককে যান্ত্রিক ও নৈর্ব্যক্তিক করে তোলে।
গ.
উদ্দীপকের '?' চিহ্নিত স্থানে সমাজবিজ্ঞানের 'জ্ঞাতিসম্পর্ক' প্রত্যয়টি বসবে।
জ্ঞাতিসম্পর্ক হলো এমন এক ধরনের সামাজিক বন্ধন যা রক্ত, বিবাহ বা কাল্পনিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে, জ্ঞাতিসম্পর্ক মূলত চার প্রকার। যথা- ১. রক্ত সম্পর্কীয় জ্ঞাতি: জন্মগত বা জৈবিক কারণে যে সম্পর্ক তৈরি হয় (যেমন- মা-বাবা, ভাই-বোন ইত্যাদি)। ২. বৈবাহিক জ্ঞাতি: বিবাহের মাধ্যমে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় (যেমন- স্বামী-স্ত্রী, দেবর-ননদ, শাশুড়ি ইত্যাদি)। ৩. কাল্পনিক বা পাতানো জ্ঞাতি: রক্তের বা বিবাহের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও যখন কাউকে জ্ঞাতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় (যেমন- ধর্মবন্ধু, পাতানো বোন ইত্যাদি)। ৪. প্রথাগত জ্ঞাতি: এটি মূলত সামাজিক প্রথা বা রীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে (যেমন- পাড়ার চাচা, বড়োভাই ইত্যাদি)।
উদ্দীপকের চিত্রে '?' চিহ্নিত স্থান থেকে চারটি ভিন্ন সম্পর্কের দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। এখানে 'মা-বাবা' হলো রক্ত সম্পর্কীয় জ্ঞাতি, 'দেবর ও ননদ' হলো বৈবাহিক জ্ঞাতি, 'বন্ধু/দোস্ত' হলো কাল্পনিক বা পাতানো জ্ঞাতি এবং 'সৎ মা' হলো প্রথাগত বা বৈবাহিক সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ। এই প্রতিটি উপাদানই জ্ঞাতিসম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন ধরনকে নির্দেশ করছে।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের '?' চিহ্নিত স্থানে জ্ঞাতিসম্পর্ক প্রত্যয়টি বসবে।
ঘ.
উদ্দীপকে উল্লেখিত জ্ঞাতিসম্পর্ক প্রত্যয়টি সামাজিক কাঠামো গঠন এবং সংহতি রক্ষায় অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
জ্ঞাতিসম্পর্ক হলো সমাজের আদি ও অকৃত্রিম ভিত্তি। আদিম সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক সমাজ পর্যন্ত মানুষের পারস্পরিক অধিকার, কর্তব্য এবং সামাজিক পরিচয় জ্ঞাতিসম্পর্কের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়ে আসছে। এটি মূলত একটি সামাজিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে।
ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখে এবং উত্তরাধিকার আইন নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক সমাজে জ্ঞাতিসম্পর্কই ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস। বিপদে-আপদে বা সামাজিক উৎসবে জ্ঞাতিরাই প্রথম এগিয়ে আসে, যা সামাজিক সংহতিকে সুদৃঢ় করে।
উদ্দীপকের উল্লেখিত মা-বাবা, বন্ধু, দেবর-ননদ এবং সৎ মা- এই প্রতিটি সম্পর্কেরই আলাদা সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। মা-বাবা যেমন সন্তানের প্রাথমিক সামাজিকীকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তেমনি বন্ধু বা পাতানো সম্পর্ক ব্যক্তির সামাজিক পরিধি ও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। আবার বৈবাহিক জ্ঞাতিরা (যেমন- দেবর-ননদ) পরিবারের সম্প্রসারণ ও আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এই বিচিত্র সম্পর্কের জালই একজন ব্যক্তিকে সমাজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, জ্ঞাতিসম্পর্ক কেবল একটি জৈবিক বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এটি ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। জ্ঞাতিসম্পর্কের মাধ্যমেই মানুষ একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, যা একটি সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য। বস্তুত সামাজিক সংহতি ও সংহতি বজায় রাখতে জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।