ক.
ওয়াকফের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ঐতিহ্যগত সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠানটি হলো দেবোত্তর।
খ.
দান ব্যক্তির ইচ্ছানির্ভর বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত সেবামূলক কার্যক্রম।
এক্ষেত্রে দাতার উদ্দেশ্যই মুখ্য, গ্রহীতার প্রয়োজন ও সমস্যার প্রতি কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ প্রথা স্বাবলম্বন নীতিতে বিশ্বাসী নয়। ফলে এর মাধ্যমে মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট হয় এবং ব্যক্তি পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এটি মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের পরিপন্থি।
গ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত রহমান সাহেব ও রাজন দাসের দান যথাক্রমে যাকাত ও দেবোত্তর।
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যাকাত অন্যতম। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের পর কোনো ব্যক্তির কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এক বছর যাবত সঞ্চিত থাকলে তার নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্ধারিত পথে বাধ্যতামূলকভাবে বিতরণ করাকে যাকাত বলে। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ কুক্ষিগত না করে সমাজের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হয়। এর ফলে সমাজের দরিদ্র ও দুস্থ শ্রেণি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। এভাবে যাকাত দানের মাধ্যমে সমাজে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিরা আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।
হিন্দুধর্মের বিধান অনুযায়ী পাপমুক্তি, মোক্ষলাভ, পুণ্যার্জন ও ভগবানের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দেবতা বা কোনো বিগ্রহের নামে ব্যক্তির সম্পত্তির আংশিক বা সম্পূর্ণ উৎসর্গ করার উপায়কে দেবোত্তর বলা হয়। সাধারণত ধর্মীয় শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ, অনাথ আশ্রম ও মানবসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেবোত্তর প্রথায় সম্পত্তি উৎসর্গ করা হয়। উদ্দীপকে রহমান সাহেব ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী প্রতি বছর তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করেন। এক্ষেত্রে তার কাজটি যাকাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা রহমান সাহেব ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং তিনি ইসলামের বিধান অনুসারে প্রতিবছর তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করেন। আর যাকাত ইসলাম ধর্মের একটি বিধান, যেখানে প্রতিবছর ধনী সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে দান করতে হয়। অপরদিকে উদ্দীপকে রাজন দাস সাহায্য দানের ক্ষেত্রে ভেদাভেদ করেন না। তিনি সকল ধরনের দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের দান করেন। রাজন দাসের এই দান দেবোত্তরকে নির্দেশ করে। কারণ হিন্দু ধর্মে কারো সম্পত্তির আংশিক বা সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্রদের দান করার বিধান রয়েছে।
ঘ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান যাকাতের ভাৎপর্য অপরিসীম।
সমাজকল্যাণে যাকাত প্রথার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিদ্যমান। যাকাত ব্যবস্থা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এতে সম্পদ সমাজের মুষ্টিমেয় লোকদের মধ্যে কুক্ষিগত হতে পারে না। সামাজিক ক্ষেত্রে যাকাত দরিদ্রতা দূর করে সামাজিক সংহতি, প্রগতি ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার উত্তম পন্থা হলো যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। যাকাত সম্পদশালীদের লোভ- লালসা এবং সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করে। উদ্দীপকে ঐতিহ্যগত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান যাকাত নির্দেশিত হয়েছে।
দুঃস্থ, অসহায় ও আর্তমানবতার কল্যাণ সাধন সমাজকল্যাণের অন্যতম লক্ষ্য। আর যাকাত সমাজের দুঃস্থ, অসহায় ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত একটি সামাজিক ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। যেকোনো রাষ্ট্রে যাকাত ব্যবস্থা চালু থাকলে অলসভাবে অর্থ জমা এবং তা থেকে প্রতি বছর যাকাত দান করে জমানো টাকা হ্রাস করতে কেউ চাইবে না। বরং স্বাভাবিকভাবে মানুষ জমানো টাকা অলসভাবে ফেলে না রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবে। এতে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বেকার সমস্যা, হ্রাস, উৎপাদন বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পুঁজি গঠন ইত্যাদি বহুমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ইসলামি বিধান মোতাবেক পরিকল্পিত উপায়ে যাকাত সংগ্রহ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাজের অসংখ্য দরিদ্র শ্রেণিকে আর্থিক দিক দিয়ে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এভাবে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। ফলে সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধন সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক কল্যাণের ক্ষেত্রে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।