ক.
বাংলাদেশে শুধুমাত্র মুসলিম নারী ও শিশু কল্যাণে প্রযোজ্য আইনটির নাম ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন।
খ.
সমাজ থেকে অবাঞ্ছিত অবস্থা দূর করে সুন্দর, সুষ্ঠু ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য যে সকল আইন প্রণয়ন করা হয় সেগুলোই সামাজিক আইন।
নাগরিকের সামগ্রিক কল্যাণে রাষ্ট্র কর্তৃক নানা ধরনের আইন প্রণয়ন করা হয়। এ সকল আইন নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যে পরিবর্তন আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ আইনগুলোর মাঝে জনকল্যাণ সম্পর্কিত আইন হচ্ছে সামাজিক আইন। মূলত সমাজের স্বাভাবিক গতিধারাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে আইন প্রণয়ন করা হয় তাই সামাজিক আইন।
গ.
রাবেয়ার স্বামীর অপরাধ যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ এর লঙ্ঘন, যা একটি সামাজিক আইন।
যৌতুক একটি সামাজিক কুপ্রথা। এটি নারী তথা সার্বিকভাবে সমাজের উন্নয়নের অন্তরায়। যৌতুক প্রথা নারী ও তার পরিবারকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে। যৌতুক নিরোধ আইন- ১৯৮০ এর মাধ্যমে সামাজিকভাবে এ প্রথা বিলোপের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আইনটিতে এদেশের নারীদের দীর্ঘদিনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে উদ্দীপকের রাবেয়ার স্বামীর মতো অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে এ আইন না মানার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
রাবেয়ার বাবা বিয়ের আগে তার হবু জামাতাকে একটি সাইকেল কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অর্থাভাবে তিনি সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। শরিফার স্বামী এজন্য তাকে নির্যাতন করে। অথচ বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনে এ ধরনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি এর জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ঐ আইন অনুযায়ী বিয়েতে কোনো এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষকে কোনো মূল্যবান জামানত দেওয়া বা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো ব্যক্তি যৌতুক দিলে অথবা নিলে অথবা নিতে সাহায্য করলে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা আর্থিক জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। আইনটিতে আরও বলা হয়েছে এটি কার্যকর হওয়ার পর যৌতুক দেওয়া বা নেওয়া সংক্রান্ত প্রচলিত সব চুক্তি বাতিল হবে। তাই বলা যায়, রাবেয়ার স্বামী ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনটি অমান্য করেছে।
ঘ.
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন রোধে উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত আইন অর্থাৎ যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই কমবেশি নারী নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে। আর এ সব নির্যাতনের একটি বড় অংশ যৌতুকের কারণে সংঘটিত হয়। বিবাহিত নারীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ছাড়াও যৌতুকের কারণে সমাজে আরও বিভিন্ন নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মূলত এ ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি রোধ করে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ আইন প্রণীত হয়।
যৌতুকের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও তার পরিবার। যৌতুকের দাবি মেটাতে গিয়ে অনেক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে তার সর্বস্ব হারাতে হয়। ফলে এ ধরনের পরিবারগুলোতে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে পরিবারে নানা ধরনের অশান্তি শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা এ কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। যৌতুক নিয়ে বিরোধের জেরে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদও ঘটতে দেখা যায়। কিছুসংখ্যক নারী অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যার মতো চরম নেতিবাচক কাজ করে বসেন। বিবাহবিচ্ছেদ বা স্ত্রীর মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দম্পতির ছেলেমেয়েরাও ভোগান্তি পোহায়। তারাও অনেক সময় অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হয়। এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০-তে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া ও এ কাজে সহায়তা করার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি যৌতুক দাবি করার জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যৌতুকের জন্য কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলে ও এ কারণে ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। যৌতুকের জন্য অঙ্গহানি ঘটালে সাজা হবে যাবজ্জীবন বা কমপক্ষে ১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। তবে কাগজে-কলমে আইনের ধারাগুলো বেশ শক্ত হলেও যৌতুক প্রথার চল বা যৌতুকজনিত সহিংস ঘটনা প্রত্যাশা অনুযায়ী কমছে না। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ। মানুষের মধ্যে এ ধারণা দিতে হবে যে যৌতুক চাইলে বা এজন্য নারীকে নির্যাতন করলে শাস্তি ভোগ অবশ্যম্ভাবী।
সার্বিক আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে আইনটি আরও ফলপ্রসূ করতে চাইলে এর কঠোর বাস্তবায়ন দরকার।