ক.
বাংলাদেশের তিনটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলো- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা।
খ.
স্থানীয় সরকার বলতে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে স্থানীয় পর্যায়ে নিযুক্ত সরকারি কর্মচারী কর্তৃক এলাকাভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়।
স্থানীয় সরকার হলো সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ। সরকার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এ ব্যবস্থায় স্থানীয় শাসন কর্তৃপক্ষের কোনো স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও নীতিনির্ধারণি ক্ষমতা থাকে না। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে এবং প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশের বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদাহরণ।
গ.
উদ্দীপকের বিধান সরকার গ্রামীণ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদের প্রধান।
ইউনিয়ন পরিষদ বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক ইউনিট। প্রাথমিক পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকান্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ভিত্তিরূপে গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪,৫৫৪টি ইউনিয়ন পরিষদ আছে। ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয় একজন চেয়ারম্যান, নয়জন নির্বাচিত সদস্য এবং তিনজন সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মহিলা সদস্য নিয়ে। নির্বাচনের উদ্দেশ্যে প্রত্যেকটি ইউনিয়নকে নয়টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে একজন পুরুষ সদস্য, তিনটি ওয়ার্ড হতে একজন করে মহিলা সদস্য এবং সমগ্র ইউনিয়ন থেকে একজন চেয়ারম্যান জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয় মোট ১৩ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে। পরিষদের সার্বক্ষণিক দাপ্তরিক কাজ করেন সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ও বেতনভুক্ত একজন সেক্রেটারি। উদ্দীপকের বিধান সরকার একটি সংস্থার নির্বাচিত প্রধান। তার সংস্থায় তিনিসহ মোট ১৩ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন। তাদের কাজে সাহায্য করার জন্য সরকারও কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সেক্রেটারি কর্মরত আছেন। বিধান সরকারের এ সংস্থাটির সাথে ইউনিয়ন পরিষদের গঠনের মিল রয়েছে। সুতরাং বলা যায়, বিধান সরকার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদের প্রধান তথা চেয়ারম্যান।
ঘ.
জনাব রফিকের প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের স্বার্থে বহুবিধ কাজ করে থাকে। তবে এই কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান কিছু সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারের সর্বনিম্ন স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। জনবহুল গ্রামাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ দুই ধরনের কাজ করে। যেমন: ১. মৌলিক কাজ, ২. উন্নয়নমূলক কাজ। ইউনিয়ন পরিষদের মৌলিক কাজের মধ্যে রয়েছে গ্রামাঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এ উদ্দেশ্যে ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির কার্যকাল ও শর্তাবলি নির্ধারণ করে। এ সংস্থাটি ইউনিয়নে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর আদায় ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে সাহায্য করে। সরকারের নীতি বা কর্মসূচি জনগণকে জানানোও ইউনিয়ন পরিষদের কাজ। ইউনিয়নে কোনো অপরাধ ঘটলে এ প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশকে জানায়। অপরাধ নিরোধ সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতাও করে। ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারকাজও ইউনিয়ন পরিষদ করে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ জনসাধারণের সার্বিক কল্যাণার্থে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজও করে। যেমন: রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, পার্ক, পুকুর, কবরস্থান, ইত্যাদি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। এছাড়া জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, দুর্যোগের সময় সেবামূলক কাজ এবং নিরাপত্তামূলক কাজ করাও ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভুক্ত। আবার বৃক্ষরোপণ, কৃষি-শিল্পের উন্নয়ন সাধন, বিনোদন ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন ধরনের কাজও ইউনিয়ন পরিষদ করে থাকে। জনগণের কল্যাণে কাজ করা হলেও কখনো কখনো ইউনিয়ন পরিষদের কার্যাবলি কিছু সীমাবদ্ধতার শিকার হয়। যেমন- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনগণ যদি অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের হয় তাহলে চেয়ারম্যান যতোই আন্তরিক হোক না কেন, তার পক্ষে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সভলভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হবে না। ইউনিয়ন পরিষদের আরেকটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা হলো- নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবল না থাকা। এছাড়া পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সচিব ও চৌকিদারদের বেতন বা সম্মানী নামমাত্র হওয়ায় তাদের মধ্যে সার্বক্ষণিক কাজ করার আগ্রহ খুবই কম। তাছাড়া করের পরিমাণ কম হওয়ায় পরিষদের নিজস্ব আয়ও তেমন নেই। উপর্যুক্ত আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ উন্নয়নে বহুবিধ কার্য সম্পাদন করলেও তার অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।