ক.
যে অনুমানে বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্তের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সার্বিক সিদ্ধান্ত অনুমিত হয় তাকে আরোহ বলে।
খ.
আরোহ অনুমানে সার্বিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে সকল দৃষ্টান্ত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ, আরোহ অনুমানে জ্ঞাত থেকে অজ্ঞাতে গমন করা হয়। আর জ্ঞাত থেকে অজ্ঞাতে বা বিশেষ থেকে সার্বিকে গমনের মাধ্যমে হলো আরোহাত্মক উল্লম্ফন। আরোহাত্মক উল্লম্ফনের মাধ্যমেই জ্ঞাত থেকে অজ্ঞাতে গমন করা হয়। তাই আরোহাত্মক উল্লম্ফনকে আরোহের প্রাণ বলা হয়।
গ.
যুক্তি-১ এ বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্তের অবাধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত স্থাপন করায় অবৈজ্ঞানিক আরোহকে নির্দেশ করে। যে আরোহ প্রক্রিয়ায় কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় না করে শুধু অবাধ ও ব্যতিক্রমহীন অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে একটি সার্বিক সিদ্ধান্ত স্থাপন করা হয় তাকে অবৈজ্ঞানিক আরোহ বলে। অবৈজ্ঞানিক আরোহকে সহজ গণনামূলক আরোহ বলে। এ ধরনের আরোহের মূল কথা হলো- এ ধরনের ঘটনা সর্বদাই ঘটতে দেখেছি, এর বিপরীত বা ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা কখনও চোখে পড়েনি। সুতরাং এ ধরনের ঘটনা সব ক্ষেত্রেই ঘটবে। অর্থাৎ অবৈজ্ঞানিক আরোহে কেবল অনুকূল দৃষ্টান্তের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিকূল দৃষ্টান্তের খোঁজ করা হয় না। ফলে এ ধরনের আরোহে প্রতিকূল দৃষ্টান্তের সম্ভাবনা থাকে। যদি কোনো সময় সিদ্ধান্ত স্থাপনের পর প্রতিকূল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাহলে সিদ্ধান্ত মিথ্যা হয়ে যায়। উদ্দীপকে বলা হয়েছে, আমি এ যাবৎ যত সাদা ফুল দেখেছি তা সবই গন্ধহীন। সুতরাং সকল সাদা ফুলই গন্ধহীন। এখানে সাদা ফুলের গন্ধহীনতার অভিজ্ঞতা ছিল অবাধ ও বাতিক্রমহীন। এর বিপরীত ও ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত তার কখনো চোখে পড়েনি। এ থেকেই সে সিন্ধান্ত নিয়েছে- সকল সাদা ফুলেই গন্ধহীন। এটি অবৈজ্ঞানিক আরোহ। অবৈজ্ঞানিক আরোহে শুধু প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতির ওপর নির্ভর করা হয়, ঘটনাবলির মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয় না। ফলে এর সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য।
ঘ.
যুক্তি-২ এ দুটি গাছের মধ্যে কান্ড, পাতা, ফুল ও ফল বিষয়ের সাদৃশ্য দেখিয়ে তাদের মধ্যে একটি আম গাছ। অতএব অন্যটিও আম গাছ হবে অনুমান করা হয়েছে, যা সাদৃশ্যানুমানকে নির্দেশ করে। সাদৃশ্যানুমান দুই প্রকার। যথা-১. সাধু সাদৃশ্যানুমান ও ২. অসাধু সাদৃশ্যানুমান। এদের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। প্রথমত, যে সাদৃশ্যানুমানে মৌলিক, গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয় বিষয়ে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, তাকে সাধু সাদৃশ্যানুমান বলে। অন্যদিকে যে সাদৃশ্যানুমানে বাহ্যিক, গুরুত্বহীন ও অনাবশ্যক বিষয়ে সাদৃশ্য দেখিয়ে অনুমান করা হয় তাকে অসাধু সাদৃশ্যানুমান বলে। দ্বিতীয়ত, সাধু সাদৃশ্যানুমানে সাদৃশ্যের বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাদের সাথে সিদ্ধান্তের একটা কার্যকারণ সম্পর্ক থাকার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু অসাধু সাদৃশ্যানুমানে সাদৃশ্যের বিষয়গুলো অপ্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বহীন হওয়ায় তাদের সাথে সিদ্ধান্তের কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা থাকে না। তৃতীয়ত, সাধু সাদৃশ্যানুমানে বৈসাদৃশ্য ও অজ্ঞাত বিষয়ের তুলনায় সাদৃশ্যের বিষয়গুলো বেশি থাকে। কিন্তু অসাধু সাদৃশ্যানুমানে সাদৃশ্যের তুলনায় বৈসাদৃশ্য ও অজ্ঞাত বিষয়ের সংখ্যা বেশি থাকে। চতুর্থত, সাধু সাদৃশ্যানুমানে কার্যকারণ সম্পর্কের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত থাকে বলে এর সিদ্ধান্তের পক্ষে সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু অসাধু সাদৃশ্যানুমানে কার্যকারণ সম্পর্কের কোনো ইঙ্গিত থাকে না বলে এর সিদ্ধান্তের পক্ষে মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পঞ্চমত, সাধু সাদৃশ্যানুমান প্রকৃতির নিয়মকানুন সম্পর্কিত জ্ঞান ও সুসংগত চিন্তাধারার সাথে সংগতিপূর্ণ। ফলে এরূপ অনুমান জ্ঞান চর্চার পক্ষে সহায়ক। অপরদিকে, অসাধু সাদৃশ্যানুমান ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সামাজিক কুসংস্কার ও কাল্পনিক ধারণার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এরূপ অনুমান জ্ঞানচর্চার পক্ষে অন্তরায়।