ক.
বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক, কৃষি, মৎস্য, পশু, জনসংখ্যা, শিক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কীয় পরিসাংখিক তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করে থাকে, তাদেরকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলে।
খ.
সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের তুলনামূলক আলোচনা নিচে দেওয়া হলো :
|
সরকারি পরিসংখ্যান
|
বেসরকারি পরিসংখ্যান
|
|
(i) যে সকল পরিসংখ্যান বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন-বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) বা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সংগৃহীত, সংকলিত ও প্রকাশিত হয় তাকে সরকারি পরিসংখ্যান বলে।
|
(i) যে সকল পরিসংথ্যান বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো গবেষক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংগৃহীত, সংকলিত ও প্রকাশিত হয় তাকে বেসরককারি পরিসংখ্যান বলে।
|
|
(ii) সরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন বিষয়, যেমন-কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, আদম শুমারী ও আরো বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করে বুলেটিন আকারে প্রকাশ করে থাকে।
|
(ii) বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- সেন্টার ফর পলিসি ডায়াল (CPD). এন.জি.ও (যেমন-ব্র্যাক, প্রশিকা), বণিক সমিতি, স্টক এক্সচেঞ্জ, বিভিন্ন ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন- ইউনেস্কো (UNESCO), ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্ব ব্যাংক (WB) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করে বুলেটিন আকারে প্রকাশ করে থাকে।
|
গ.
কোনো প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অবস্থার উপর ভিত্তি করে তাদের প্রশাসনিক ও অন্যান্য কাজের জন্য যে সমস্ত তথ্য প্রকাশ করে থাকে তাই প্রকাশিত পরিসংখ্যান।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হয়ে থাকে। যেমন-
১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো হলোবাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পরিসংখ্যানিক প্রতিষ্ঠান, যা সরকারি পরিসংখ্যান সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মূল সংস্থা। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের আদমশুমারি, অর্থনৈতিক শুমারি, পশু শুমারি, কৃষিশুমারি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের উপর তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করা। প্রতিষ্ঠানটি নিজের সংগৃহীত তথ্য ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংগৃহীত তথ্যও প্রকাশ করে থাকে। ইহা শুমারি জরিপের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে নমুনা জরিপও পরিচালনা করে থাকে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যানের অন্যান্য উৎসের সাথে সমন্বয় সাধন করে থাকে।
২. বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান : বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক যেমন—ডাচ্ বাংলা ব্যাংক, আরব বাংলাদেশ ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ইত্যাদি এবং কিছু বীমা কোম্পানি যেমন—জীবন বীমা, বাংলাদেশ সাধারণ বীমা, ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানি ও আমেরিকান লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানি সমূহ তাদের দৈনন্দিন ও বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রচুর তথ্য প্রকাশ করে থাকে। বীমা কোম্পানিসমূহ তাদের রিপোর্টে দুর্ঘটনা, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি পরিসংখ্যান এবং ব্যাংকসমূহ বৎসরান্তে লাভ- লোকসানের পরিসংখ্যান রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করে থাকে।
৩. আন্তর্জাতিক সংস্থা : কতকগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন- কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (FAO), বিশ্ব ব্যাংক (WB), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IME), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা (WHO), জাতিসংঘ বাণিজ্য সংস্থা (UNCTAD), জাতিসংঘ জনসংখ্যা কার্যক্রম (UNFPA) ইত্যাদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামজিক উন্নয়নের উপর বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধান পরিচালনা করে এবং রিপোর্ট আকারে পরিসংখ্যান তথ্য প্রকাশ করে থাকে ।
৪. অন্যান্য সংস্থা : বেশ কিছু সংখ্যক এনজিও যেমন-গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, প্রশিকা, ব্র্যাক ইত্যাদি বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার জরিপ কাজ পরিচালনা করে এবং পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। এগুলো ছাড়া বাণিজ্য সংস্থা, চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, ট্রেড ইউনিয়ন বিভিন্ন প্রকার পরিসংখ্যান তথ্য প্রকাশ করে থাকে। উপরোক্ত আলোচনা হতে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম।
ঘ.
বাংলাদেশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের উৎকর্ষতা সাধনে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবে।
১. দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরিসংখ্যানবিদদের দ্বারা অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করতে হবে।
২. তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং বর্তমান নমুনা কাঠামো ব্যবহার করতে হবে।
৩. দক্ষ পরিসংখ্যানবিদদের সাহায্যে সঠিক নমুনায়ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ, উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
8. তথ্য সংগ্রহের পূর্বে তথ্য সংগ্রহকারীদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দান করতে হবে।
৫. প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যানিক গবেষণা এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করে তথ্য উপস্থাপনার মান উন্নত করতে হবে।
৬. তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যাবলির সমন্বয় সাধন করতে হবে।
৭. দক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করে তথ্য উপস্থাপনার মান উন্নত করতে হবে।
৮. তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্যের উপস্থাপনা, বিশ্লেষণ ও মুদ্রণে যে অযথা বিলম্ব হয় তা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও কার্যকর করতে হবে।
৯. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে অধিক দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে অধিক শক্তিশালী করতে হবে।
১০. তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশনার দায়িত্ব মূলত সরকারের হলেও পরিসংখ্যানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকারের প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তরাখতে হবে।
উপযুক্ত ব্যবস্থাসমূহ গৃহীত হলে বাংলাদেশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে।