ক.
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬০০ সালে গঠিত হয়।
খ.
১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলা প্রদেশকে শাসন করার যে নীতি গ্রহণ করে, তা-ই 'দ্বৈত শাসন' নামে পরিচিত।
দ্বৈত শাসন হলো দুইজনের শাসন। এ ব্যবস্থায় বাংলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ফৌজদারি বিচার, শান্তিরক্ষা, দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব ছিল নবাবের ওপর। অন্যদিকে বাংলার রাজস্ব আদায়, দেওয়ানি সংক্রান্ত বিচার, জমি-জমার বিবাদ সম্পর্কিত বিচার কোম্পানির ওপর ন্যস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা, আর নবাব লাভকরে ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। লর্ড ক্লাইভের বাংলা শাসনের এ অভিনব নীতিই 'দ্বৈত শাসন' নামে পরিচিত।
গ.
উদ্দীপকের সাথে আমার পাঠ্যপুস্তকে উল্লিখিত ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক ঘটনা বঙ্গভঙ্গের মিল রয়েছে। নানা কারণে বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশ শাসকদের 'ভাগ করো শাসন করো' নীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বঙ্গভঙ্গ। ভারতে নিযুক্ত তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার কথা চিন্তা করে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর তদানীন্তন বঙ্গ প্রেসিডেন্সিকে দুটি ভাগে ভাগ করেন। তার এ কর্মকাণ্ডেরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায় উদ্দীপকে।
লর্ড কার্জন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় হয়ে এসে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। কারণ বাংলা প্রদেশ ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশসমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ। এর আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিত। এছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় আর্থ-সামাজিক সুবিধাটি নিশ্চিত করা, ব্রিটিশদের Divide and Rule Policy-এর বাস্তবায়ন করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করে দুটি প্রদেশে রূপান্তরিত করেন, যা বঙ্গভঙ্গ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। এ পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ (দার্জিলিং বাদে জলপাইগুড়ি, পার্বত্য ত্রিপুরা ও মালদাহ জেলাসহ) এবং আসাম নিয়ে 'পূর্ব-বাংলা ও আসাম' নামে একটি নতুন প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঢাকাকে নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় এবং এর শাসনভার অর্পণ করা হয় স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের ওপর। কলকাতাকে রাজধানী করে অবিভক্ত বাংলার অন্যান্য অংশ নিয়ে 'বঙ্গ প্রদেশ' প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ঘ.
বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে বঙ্গভঙ্গ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানরা সামাজিক মর্যাদা ফিরে পায় এবং তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম তথা সার্বিক দিকে প্রগতি নিশ্চিত করার শুভ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে, যার ফলশ্রুতিতে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।
ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গ প্রদেশকে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এই দুই অঞ্চলে বিভক্ত করা হলে উভয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মুসলমান সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে সমর্থন জানালেও কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে। কারণ বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের অর্থনৈতিক ও পেশাগত স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাছাড়া কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে প্রচার করা হয় যে, বঙ্গভঙ্গের অর্থ হচ্ছে 'মাতৃভূমিকে বিভক্ত করা'। তাই বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদস্বরূপ তারা ব্রিটিশ পণ্য বর্জনে স্বদেশি আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাতে থাকে। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও হিন্দুদের প্রচণ্ড বিরোধিতায় ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করে। দিল্লির রাজদরবারে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর তারা বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে দুই বাংলাকে আবার একত্র করে।
সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানরা কিছুটা লাভবান হলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে ফাটল ধরে। উভয়ের মধ্যে সন্দেহ, রেষারেষি মারাত্মক রূপ নেয়। এ বৈরী সম্পর্কের রেশ ধরেই এক সময় তারা আলাদা হয়ে যায়।