(ক)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬শে মার্চ পালন করা হয়।
(খ)
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গণবিরোধী কাজ ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে পরিচালিত আন্দোলনই ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত।
স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেন। বাঙালির ছয় দফা দাবিকে নস্যাৎ করে দিতে আইয়ুব সরকার ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলা দায়ের করে। এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও ছাত্রদের এগারো দফাভিত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে এবং গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক বিকাশে এই আন্দোলন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এর প্রেক্ষিতে আইয়ুব খানের পতন ঘটে।
(গ)
উদ্দীপকের ঘটনার সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের বৈষম্যের মিল আছে।
উদ্দীপকে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রের পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে জনবহুল প্রদেশটি কেন্দ্রের নিকট থেকে নানা অগণতান্ত্রিক আচরণের শিকার হয়। উক্ত প্রদেশের জনগণের মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন অস্বীকার করে সামরিক, বেসামরিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়। উদ্দীপকের এই ঘটনার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ঘটনার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। উদ্দীপকের নীতির অনুরূপ পশ্চিম পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে চরম শোষণ চালায়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মাত্র ৩২% বাঙালি মন্ত্রী থাকলেও তারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি। ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে ১৭ জন সচিবের মধ্যে মাত্র দুজন বাঙালি ভারপ্রাপ্ত সচিব ছিলেন। আবার পররাষ্ট্র দপ্তরে ৭৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের ছিল মাত্র ৩০ জন। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ৯১.৯% পশ্চিম পাকিস্তানি থাকলেও মাত্র ৮.১% পূর্ব পাকিস্তানি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে জেনারেল, লেফটেনেন্ট জেনারেলের পাশাপাশি ১৩ জন মেজর জেনারেল থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১ জন মেজর জেনারেল ছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৬২-৬৩ অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানে ২০৩.৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭৬.৫ কোটি টাকা। এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক শোষণ চালানো হয়। ৫৬.৪% মানুষের মুখের ভাষার পরিবর্তে মাত্র ৭.২% মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা চালানো হয়। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈষম্য করা হয়। এমনকি খেলাধুলার স্টেডিয়াম, বিনোদন কেন্দ্র ও শিশু পার্কের মতো সুযোগ-সুবিধাও মূলত পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।
(ঘ)
মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানকে দাবিয়ে রাখাই ছিল এই বৈষম্যের প্রধান কারণ।
পূর্ব পাকিস্তান যেন স্বাধিকার ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে না পারে, সেজন্য পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ করতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানে সকল কাঁচামাল উৎপাদিত হলেও তা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতো। তাছাড়া রাজস্ব ও আয় পূর্ব পাকিস্তানে বেশি হওয়া সত্ত্বেও সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। সকল বিমা, ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত হতো সেখানে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান সবসময় পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়, যার ফলে এটি অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি।
আর্থিক দিক থেকে প্রথমদিকে পশ্চিম পাকিস্তান দুর্বল থাকলেও পূর্ব বাংলা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ফলে এর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের কারণে পূর্ব বাংলার মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। শিল্পের কাঁচামাল পূর্ব পাকিস্তানে উৎপন্ন হলেও বড় বড় শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানে যে কয়টি শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার মালিকানাও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার ছিল সবক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী এবং এই কেন্দ্রীয় প্রশাসনে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি না থাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থান্বেষী মহল কৌশলে পূর্ব বাংলাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
তাই বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখাই ছিল সব বৈষম্যের প্রধান কারণ।