(ক)
আবুল বরকত ছিলেন একজন ভাষাশহিদ।
(খ)
তমদ্দুন মজলিশ হলো ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রথম সাংস্কৃতিক সংগঠন।
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ঢাকায় তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়, যা ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা। ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার জন্য তমদ্দুন মজলিশ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে।
(গ)
উদ্দীপকের চরণ দুটি আমার পঠিত ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তারা এদেশের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত করে। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যা ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত। এই আন্দোলনে রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত ও সালামের মতো বীর সন্তানেরা শহিদ হন। উদ্দীপকের সংগীতটিতে এই শহিদদের আত্মত্যাগই ফুটে উঠেছে।
'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি' গানটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী রচনা করেন। এখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মত্যাগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই আন্দোলন ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক মনোভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্তানের ৫৬.৪০ শতাংশের মুখের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মাত্র ৩.২৭ শতাংশের মুখের ভাষা উর্দুকে তারা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালি ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এই বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এদিন সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাঙালি রাজপথে নেমে আসে। পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে রফিক, বরকত, শফিক, জব্বার, সালাম প্রমুখ শহিদ হন। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির এই আত্মত্যাগই উদ্দীপকের পঙক্তিগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে।
(ঘ)
উদ্দীপকের সংগীতটিতে ভাষা আন্দোলনের ইঙ্গিত রয়েছে, যা বাঙালিকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। বাঙালি যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং তাদেরকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়, এই আন্দোলন তা প্রমাণ করে। ভাষাশহিদদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা অর্জিত হয় এবং এই অর্জন বাঙালিকে সব আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা দেয়।
উদ্দীপকের সংগীতটিতে বাঙালির আত্মত্যাগের পাশাপাশি তাদের অধিকারবোধ ও প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগ থেকে পাওয়া জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান সরকারের প্রবর্তিত শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্রসমাজ এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবির প্রেক্ষিতে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বীর বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর ১৯৬৯ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, যা আইয়ুব খানের পতনকে ত্বরান্বিত করে। পরে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু তাদেরকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া না হলে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এমনকি ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালি স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। বাঙালির এই ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের পেছনে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে উৎসারিত জাতীয়তাবাদী চেতনা।
পরিশেষে বলা যায়, ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া রফিক, বরকত, শফিক, জব্বার, সালাম প্রতিনিয়ত বাঙালির মধ্যে অধিকারবোধ সৃষ্টি করে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অনুপ্রেরণা দেয়।