(ক)
জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো (UNESCO) একুশে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা দেয়।
(খ)
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতকে 'কালরাত' বলা হয় কারণ এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালায়।
এই হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা তৈরি করেছিলেন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী। পাক হানাদার বাহিনী ঢাকা নগরীকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। রাতের অন্ধকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরোনো ঢাকা, ধানমন্ডি, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর প্রভৃতি স্থানে নিরীহ নাগরিকদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানেও একইভাবে গণহত্যা চালানো হয়। এই নৃশংসতার কারণে রাতটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে 'কালরাত' বলা হয়।
(গ)
উদ্দীপকের কবিতার লাইনগুলো ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই আন্দোলনের পটভূমি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
বাঙালি জাতির রাজনৈতিক বিকাশ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মূলত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গণবিরোধী কর্মকাণ্ড, সামরিক শাসনের অবসান এবং স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তানে এই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালিরা রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। এই বৈষম্যের ফলে বাঙালিদের মনে যে ক্ষোভ জন্ম নেয়, তা স্বায়ত্তশাসন আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে 'ছয় দফা' দাবির রূপ নেয়। পাকিস্তান সরকার এই দাবি উপেক্ষা করে এবং আন্দোলন দমনের জন্য ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করে।
আগরতলা মামলার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। এই আন্দোলনকে আরও জোরদার করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের ৮টি বিরোধী রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে 'গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি' (Democratic Action Committee) বা 'ডাক' (DAC) নামে একটি ঐক্যজোট গঠন করে। আইয়ুবের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে 'ডাক'-এর ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ শুরু হয়। এই আন্দোলনে ছাত্ররা তাদের 'এগারো দফা' দাবি নিয়ে অংশগ্রহণ করে। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সমাবেশে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ বাধে এবং পুলিশ গুলি চালালে ছাত্রনেতা আসাদসহ আরও তিনজন নিহত হন। আসাদের এই আত্মত্যাগ আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
(ঘ)
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং তা চূড়ান্ত স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক সাফল্য ছিল আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তিলাভ। এছাড়া এই আন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সূচনার পাশাপাশি সর্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। রাজনীতিতে আইয়ুব খান সমর্থিত এলিট শ্রেণির মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ আরও সুসংহত রূপ ধারণ করে।
এই আন্দোলনের মাধ্যমে আইয়ুব খানের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে চূড়ান্ত ত্যাগের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়। এই পর্যায়ে বাঙালি জাতি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে ধাবিত হতে শুরু করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যাপক গণরায় প্রদানের মাধ্যমে এই জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ছয় দফা ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে, যার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত হয়। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব অপরিসীম।