ক.
আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি, খিলাফত-ই-রব্বানি এবং বামপন্থী গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
খ.
১৯৬৬ সালের ছয় দফাকে বাঙালির মুক্তির সনদ বলা হয়েছিল, কেননা তা ছিল বাঙালির ভালোভাবে মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় একগুচ্ছ দাবি।বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ছয় দফা তোলা হয়। এই কর্মসূচি পাকিস্তানিদের হাতে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি জাতিকে স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। এজন্যই ছয় দফা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত।
গ.
উদ্দীপকের ছকটিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখানো হয়েছে।
পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকায় কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পূর্ব পাকিস্তানের সব আয় পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। প্রাদেশিক সরকারের হাতে মুদ্রাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব ব্যাংক, বিমা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যবস্থা পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব কারণে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানে রাজধানী স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়। এর পুরো সুফল ভোগ করে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীসহ ধনিক শ্রেণি। শুধু করাচি শহর নির্মাণেই ব্যয় করা হয়েছিল ৫,৭০০ মিলিয়ন টাকা। এটি ছিল পাকিস্তান সরকারের মোট ব্যয়ের ৫৬.৪% । অথচ এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি ব্যয় ছিল মোট বাজেটের মাত্র ৫.১০% । পাকিস্তানের রাজধানী ছিল করাচিতে। পশ্চিম পাকিস্তানে ফেডারেল রাজধানী, সকল প্রশাসনিক সদরদপ্তর স্থাপিত হওয়ায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও সেচখাতে ব্যয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময় যে ৩৮টি শিল্প কলকারখানা লাভ করেছিল তার মধ্যে পূর্ব বাংলায় ছিল ২০টি এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ১৮টি। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পকলকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে, অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় তেমন উল্লেখযোগ্য কলকারখানা গড়ে ওঠেনি।
উদ্দীপকের ছকটিতে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে রাজস্ব ব্যয়, শিল্প উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক সাহায্যের ব্যয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে যা দুই প্রদেশের মধ্যকার বৈষম্যকেই নির্দেশ করে। তাই বলা যায়, ছকে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখানো হয়েছে।
ঘ.
পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা যোগালেও রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্যও ছিল প্রকট।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামরিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সবক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতি অনুসরণ করে। আর এসব বৈষম্যের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত হয় । উদ্দীপকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখানো হয়েছে। তবে এ অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের একমাত্র কারণ ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই পূর্ব বাংলা রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণের আরেকটি ক্ষেত্র ছিল সামরিক বৈষম্য। সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল অতি নগণ্য। ১৯৫৫ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, সামরিক বাহিনীর মোট ২,২১১ জন কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ৮২ জন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক সর্বোচ্চ বৈষম্যের শিকার হয়েছে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরেও পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাধিক্য ছিল। আবার, শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। অথচ ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যায় ছিল দ্বিগুণ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষাখাতে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ২০৮৪ মিলিয়ন রুপি এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৭৯৭ মিলিয়ন রুপি। মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হওয়ার পরও শুধু উর্দুকে পাকিস্তানের শাসকরা রাষ্ট্র ভাষা করতে চেয়েছিল। এভাবে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে। এমন বৈষম্যই বাঙালিকে পরবর্তীতে স্বাধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ করে।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়; বরং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক শোষণ বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে।