ক.
১৯৬৫ সালে সালে পাক-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
খ.
মৌলিক গণতন্ত্র হলো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের প্রবর্তিত একটি বিতর্কিত স্থানীয় সরকার পদ্ধতি।
আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার অজুহাতে ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি নতুন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চালু করেন। বাস্তবে এর লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায়- ১. ইউনিয়ন পরিষদ, ২. থানা পরিষদ, ৩. জেলা পরিষদ এবং ৪. বিভাগীয় পরিষদ এই চার স্তরের কাঠামো ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ ব্যবস্থাকে জেনারেল আইয়ুব খান ও তার সমর্থক কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কৌশল বলে গণ্য করেছিল।
গ.
উপরের চিত্রটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইঙ্গিত করে ।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। সেদিন সকাল থেকেই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র-জনতা দলে দলে সমবেত হয় । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সমাবেশে যে ভাষণ দেন তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ৪টি। যথা—১। চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার; ২। সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া; ৩। গণহত্যার তদন্ত করা এবং ৪। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এর বাইরে আরও বেশ কিছু দাবি তার ভাষণে উত্থাপন করা হয়। তিনি বাংলাদেশের সব অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন । কৌশলে তিনি প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পরোক্ষভাবে ঘোষণা দেন। ঘোষণায় তিনি বলেন, “তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব।” তিনি আরো বলেন, “মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
উদ্দীপকের চিত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লাখো জনতার সম্মুখে বক্তৃতারত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, যা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে নির্দেশ করে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ ভাষণ একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
ঘ.
উক্ত ঘটনা তথা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতা জন্য প্রস্তুত হবার পরোক্ষ ঘোষণা— উক্তিটি যথার্থ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। সেসময় জনগণ অধীর আগ্রহে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষা করছিল। তারা আর ঘরে ফিরে যেতে প্রস্তুত ছিল না। ততদিনে তাদের মনে স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়।
৭ মার্চের ভাষণের পরদিন থেকে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জাহাজ ও বিমানযোগে সৈন্য ও অস্ত্র আনতে থাকে। প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টে কৌশলে বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। জনগণও বিভিন্ন জায়গায় সামরিক যান চলাচলে বাধা দেওয়া শুরু করে। সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার ও সৈনিকগণ ৭ মার্চের ভাষণের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করতে আসছে শুনে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সর্বোপরি এ ভাষণের পর প্রত্যেক জেলা, থানা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ভাষণই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ‘বজ্রকণ্ঠ' নামে প্রচারিত হয়েছে বারবার। এই একটি ভাষণই পুরো জাতিকে দীর্ঘ ৯ মাস ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে প্রবল মানসিক শক্তি যুগিয়েছে। এ ভাষণটি ছিল বাঙালির প্রতিরোধ ও মুক্তির লক্ষ্যে চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকনির্দেশনা ।
পরিশেষে বলা যায়, বাঙালির অধিকার আদায় ও মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হবার জন্য পরোক্ষ ঘোষণা দিয়েছিলেন।