ক.
'সামাজিক চুক্তি' (Social Contract) গ্রন্থটি লিখেছেন প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো।
খ.
জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।
জাতি বলতে বোঝায় এমন এক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী যারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিবাসী। অন্যদিকে, কোনো জনসমাজের মধ্যে যখন রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার হয় তখন তাকে জাতীয়তা বলে। জাতি গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগঠন থাকা অপরিহার্য, কিন্তু জাতীয়তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। জাতি গঠনের পশ্চাৎ হলো জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতা। কিন্তু জাতীয়তা গঠনে স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। বরং মানসিক ঐক্যানুভূতি, অভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য থাকা প্রয়োজন।
গ.
উদ্দীপকে জাতীয়তার ভাষা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উপাদানের কথা বলা হয়েছে।
ভাষা হলো মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। কোনো জনসমষ্টির সকল মানুষের ভাষা যদি একই হয় এবং তাদের সাহিত্যও যদি এক হয় তাহলে স্বভাবতই তারা নিজেদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য অনুভব করে এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। এছাড়া একই জনসমষ্টির মধ্যে একই ধরনের আচরণ ও রীতিনীতি গড়ে উঠলে তারা নিজেদেরকে অন্য জনসমষ্টি থেকে স্বতন্ত্র মনে করে। আচরণ ও রীতিনীতিগত এই ঐক্য জনসমষ্টিকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। এই ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উপাদানটির কারণেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণ জীবন উৎসর্গ করেছিল। এই ভাষা আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট বাঙালি জাতীয়তাবাদই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে প্রেরণা যুগিয়েছে। উদ্দীপকে এ বিষয়েরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাবশালী হওয়ায় এক অংশের শাসকরা তাদের ভাষাকে 'রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে অন্য অংশের লোকজন আন্দোলন করে। এক পর্যায়ে তা স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয় এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পূর্বোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, এখানে ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি স্বাধীনতার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে জাতীয়তার উপাদান ভাষা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের কথা বলা হয়েছে।
ঘ.
ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে সেই জাতীয়তাবাদ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রে রূপ লাভ করেছে বলে আমি মনে করি।
জাতিরাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্র যা একটি নির্দিষ্ট জাতির ভিত্তিতে গঠিত হয়। যখন কোনো জনসমষ্টির মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গভীর ঐক্য গড়ে ওঠে এবং তারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে, তখনই তাকে জাতিরাষ্ট্র বলা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সেই ঐক্যের প্রথম সোপান যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। জাতীয়তাবোধের এই বিকাশই একটি পরাধীন জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য যে আত্মত্যাগ হয়েছিল, তা জনগণের মধ্যে দেশপ্রেমের সঞ্চার করে। এই দেশপ্রেমই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি ছিল। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রয়োজন। উদ্দীপকের এই ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে যে, ১৯৫২ সালের চেতনা ধাপে ধাপে ১৯৬৬ এর ছয় দফা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ এর সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই বাঙালি জাতি তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করে।
ভাষা আন্দোলন ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক আন্দোলনে মোড় নেয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালির মনে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিল, তা-ই ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। একটি জাতি যখন তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জন করে, তখন সেটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ার একটি সার্থক উদাহরণ, যেখানে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা থেকে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। তাই বলা যায়, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশকে একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত করেছে।