ক.
সিপাহি বিদ্রোহ হয়েছিল ১৮৫৭ সালে।
খ.
ইউরোপীয় অপরাধীদেরকে বিচার করার জন্য ভারতীয় বিচারকদের ক্ষমতা দিয়ে লর্ড রিপন: যে আইন পাস করেন তা ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত ।
লর্ড রিপনের শাসনামলের অন্যতম একটি সংস্কার হলো ইলবার্ট বিল' প্রণয়ন । ইলবার্ট বিলের মাধ্যমে লর্ড রিপন ভারতীয় এবং ইউরোপীয়দের মধ্যে জাতিগত বৈষম্য নিরসনে সচেষ্ট হন। ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুসারে কোনো ভারতীয় ম্যাজিস্ট্রেট পূর্বে ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করতে পারতেন না। তাই তিনি ‘ইলবার্ট বিল' প্রণয়নের মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকদের সেই ক্ষমতা প্রদান করেন। ইউরোপীয়রা এ আইনকে অপমানজনক মনে করে এর বিরোধিতা শুরু করে ।
গ.
উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত আন্দোলনটি হলো খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ।
উদ্দীপকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দুটি ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক দল প্ৰথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একসাথে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছিল। এই আন্দোলনে প্রথমে মুসলিমরা তুর্কি সম্রাজ্য রক্ষার জন্য খেলাফত আন্দোলন শুরু করেছিল । যা পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলনের রূপ নেয়। এতে দুই পৃথক ধারার রাজনৈতিক দল তথা মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস একত্রিত হয়।
খেলাফত আন্দোলন ছিল বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান খেলাফত রক্ষার আন্দোলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে গেলে তার মিত্র, তুরস্কের ভূখণ্ড ব্রিটেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা ভাগাভাগি করে নেয়। তুরস্ক তখন ছিল ইসলামের খেলাফতের ধারক। বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের কারণে তুরস্কের খিলাফতের অস্তিত্ব থাকা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের মুসলিমরা খিলাফতের অস্তিত্ব রক্ষায় ঐ আন্দোলন করে। ১৯২০ সালের জুন মাসে খিলাফত কমিটির আহ্বানে এলাহাবাদে
এক সভায় সরকারের সাথে অসহযোগিতার কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। অপরদিকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনও ছিল সরকারবিরোধী। মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থনের প্রত্যাশায় গান্ধী খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেন ।
খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি একই রকম ছিল। উভয় কর্মসূচিতেই ইংল্যান্ডে তৈরি পণ্য বর্জন করা হয়েছিল। দুই আন্দোলনেই জনগণকে দেশীয় পণ্যসামগ্রী ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। তবে খিলাফত আন্দোলন মাওলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী ও আবুল কালামের নেতৃত্বে চললেও অসহযোগ আন্দোলন শুধু গান্ধীজির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। আর খেলাফত আন্দোলন শুধু মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত হলেও অসহযোগ আন্দোলনে হিন্দু-মুসলমান সবার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সর্বোপরি খেলাফত আন্দোলন ধর্মীয় অনুপ্রেরণা থেকে পরিচালিত হয়েছিল, কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন । সুতরাং দেখা যায়, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে মিল-অমিল উভয়ই ছিল । এই দুই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতে হিন্দু- মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছিল ।
ঘ.
উক্ত আন্দোলন তার অহিংসরূপ হারানোর কারণে ব্যর্থ হতে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত আরও বেশ কিছু কারণে এ আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । খেলাফত আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী খেলাফত কমিটির প্রথম সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে, ব্রিটিশ সরকার তুরস্কের খলিফার মর্যাদা রক্ষার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলে মুসলমানরা সরকারের সঙ্গে অসহযোগ নীতি অনুসরণ করবে। প্রয়োজনে তারা ব্রিটিশ পণ্যও বর্জন করবে। মহাত্মা গান্ধী এসময়ে খেলাফতের বিষয়ে কংগ্রেসের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন। পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেস অসহযোগের কর্মসূচি হিসেবে সরকারি চাকরি ও পদবি ত্যাগ, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ আদালত ও আইন ব্যবসা বর্জন, বিলাতি দ্রব্য পরিহার ইত্যাদি প্রস্তাব গ্রহণ করে । একই সময়ে নাগপুরে খেলাফত কমিটি ও মুসলিম লীগ অসহযোগ আন্দোলনের বিস্তারিত কর্মসূচি অনুমোদন করে এবং উভয় সংগঠন স্বাধীনতাকে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে ঘোষণা করে। ফলে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন হিন্দু মুসলমানের যৌথ আন্দোলনে পরিণত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু কারণে এ আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে অহিংসার স্থলে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ১৯২১ সালের আগস্ট মাসে মালাবারে কৃষকেরা জমিদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশ্রয় নেয়। এরপর ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের চৌরিচোরা নামক স্থানে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা থানা আক্রমণ করে ২১ জন সিপাহি ও একজন দারোগাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে ।
গান্ধী তার অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনকে এভাবে সহিংসতায় পরিণত হতে দেখে আন্দোলনের সকল কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। এতে । সারাদেশে হতাশার সৃষ্টি হয়। সরকার শিগগিরই গান্ধীকে গ্রেফতার করে। অসহযোগ আন্দোলনের অবসারে খেলাফত আন্দোলনও দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯২৪ সালে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক খেলাফত বিলুপ্ত ঘোষণার পর এ আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। খিলাফত ও অসযোগ আন্দোলন সফল না হলেও সে গণজাগরণ ছিল অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয়। উপমহাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে আন্দোলন দুটির অবদান ও গুরুত্ব অপরিসীম।