(ক)
সম্রাট শাহজাহানের চারজন পুত্র ছিল।
(খ)
পৃথিবী বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত অনুপম শিল্পকীর্তির অন্যতম নিদর্শন।
তৎকালীন মূল্যে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সাত বছরে এই ময়ূর সিংহাসন নির্মিত হয়েছিল। সিংহাসনের সোনার তৈরি চারটি স্তম্ভের ওপর ছিল একটি কারুকার্যমণ্ডিত চন্দ্রাতপ। প্রতিটি স্তম্ভের শীর্ষে ছিল মুখোমুখি বসানো একজোড়া ময়ূর। অনিন্দ্যসুন্দর ও মূল্যবান এই সিংহাসনটি সম্রাট শাহজাহানের সৌন্দর্যজ্ঞান ও ঐশ্বর্যের উজ্জ্বল নিদর্শন। ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণকালে এটি লুটে নিয়ে যান। পরে পারস্য থেকে ব্রিটিশরা দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়ার পথে জাহাজ ডুবিতে ময়ূর সিংহাসনটি হারিয়ে যায়।
(গ)
উদ্দীপকের বিষয়বস্তু মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত অমর স্থাপত্যকীর্তি তাজমহলের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
সম্রাট শাহজাহান ছিলেন অত্যন্ত সৌন্দর্যপিপাসু ও শিল্পমনা মানুষ। ভারতের স্থাপত্যশিল্পে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর সময়ে নির্মিত স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে তাজমহল সবচেয়ে বিখ্যাত। বস্তুত, তাজমহল তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
উদ্দীপকে বর্ণিত "হীরা মুক্তা-মাণিক্যের ঘটা... কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল" কবিতাংশটি মুঘল সম্রাট শাহজাহানকে নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত 'শাহজাহান' কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি। এতে তাজমহলের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য ও গভীর শোকের ইঙ্গিত রয়েছে। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধির ওপর জগদ্বিখ্যাত এই সৌধটি নির্মাণ করেন। তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। ভারতের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে নির্মিত এই সমাধিসৌধটি শুধু মুঘল স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শনই নয়, বরং স্ত্রীর প্রতি চিরন্তন ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবেও স্বীকৃত। বিশ হাজার দক্ষ কারিগর দীর্ঘ বাইশ বছর পরিশ্রম করে শাহজাহানের স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেন। এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন শিল্পী ইসফানদিয়ার রুমী এবং প্রধান স্থপতি ইরানের ঈসা সিরাজী। পুরোপুরি শুভ্র মর্মর পাথরে নির্মিত তাজমহলকে ঐতিহাসিক হ্যাভেল ভারতের 'ভেনাস ডি মিলো' বলে অভিহিত করেছেন। ইন্দো-পারসিক রীতির সংমিশ্রণে নির্মিত এই স্থাপনাটি বিশ্বের প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের একটি এবং একবিংশ শতকেও এটি নতুন সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে মনোনীত। পর্যটকদের কাছে এটি ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থাপনা, যা আমাদের কাছে শিল্পানুরাগী সম্রাট শাহজাহান ও তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি অনিঃশেষ ভালোবাসাকে তুলে ধরে।
(ঘ)
মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁর সমাধির ওপর বিশ্ববিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম তাজমহল নির্মাণ করেন। প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসাই তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। এ দিক থেকে তাজমহল নির্মাণের উদ্দেশ্যকে যৌক্তিক বলা যেতে পারে।
মমতাজ তাঁর ফুফু নূরজাহানের মতোই অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এবং প্রতিভাবান ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গির আসফ খানের কন্যার সৌন্দর্য ও প্রতিভার কথা জেনে প্রিয় পুত্র খুররমের (শাহজাহান) সাথে তাঁর বিয়ে দেন। ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে মহাধুমধামে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। দাম্পত্য জীবনে সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহল অত্যন্ত সুখী ছিলেন। মমতাজ তাঁর সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে স্বামীর হৃদয় জয় করেছিলেন এবং তাঁর এই গুণাবলিই মৃত্যুর পর শাহজাহানকে অনন্য সমাধিসৌধ তাজমহল নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছিল।
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাকে অমরত্ব দেওয়ার জন্য শাহজাহানের আকুতির প্রশংসা করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন 'শাহজাহান' কবিতাটি, যার অংশবিশেষ উদ্দীপকে উদ্ধৃত হয়েছে। মমতাজ মহল ছিলেন একজন প্রতিভাময়ী ও উন্নত সাংস্কৃতিক রুচির নারী এবং নম্রতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও ভালোবাসার জোরে তিনি স্বামী শাহজাহানের হৃদয়ের রানিতে পরিণত হয়েছিলেন। সম্রাট রাজ্য পরিচালনার অনেক ব্যাপারেও তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। আরও কয়েকজন স্ত্রী থাকলেও তিনি মমতাজ মহলকেই প্রধান মহীয়ষীর আসন দান করেন। মমতাজকে সম্রাট 'মালিকা-ই-জাহান' (বিশ্বের রানি) এবং 'মালিকা-উজ-জামান' (যুগের রানি) উপাধি দিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে মমতাজ মহল ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ ও উদারমনা।
১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন চতুর্দশ সন্তান প্রসবকালে ৩৯ বছর বয়সী মমতাজ মারা যান। এতে সম্রাট শাহজাহান অত্যন্ত বেদনাহত হন। মমতাজের মৃত্যুর পর তিনি প্রায়ই বলতেন, "রাজ্যে আর কোনো মাধুর্য নেই, জীবনের প্রতি আমার আর কোনো মোহও নেই।" প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতি চিরজাগরূক রাখতে সমাধির ওপর তাজমহল নির্মাণ করেন শাহজাহান। এটি একইসঙ্গে চিরন্তন প্রেম এবং স্থাপত্যশিল্পের এক অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন।