(ক)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
(খ)
পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাব্য ফলাফল জানতে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন।
যেকোনো সমাজের উন্নয়নের জন্য আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না, যদি সেই পরিকল্পনা সামাজিক বাস্তবতার আলোকে প্রণীত না হয়। সমাজে কী সমস্যা রয়েছে, তার সমাধানে বাধা কোথায়, এর মাধ্যমে কোন শ্রেণির মানুষ কতটা উপকৃত হবে, গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে কী কী সামাজিক বাধা রয়েছে এবং কীভাবে তা দূর করা যায়, এসব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন।
(গ)
উদ্দীপকের রাজু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়টি অধ্যয়ন করছে তা হলো 'সমাজবিজ্ঞান'। কারণ, উদ্দীপকে বলা হয়েছে এই বিষয়টি ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ইউনেস্কোর সহযোগিতায় স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা সমাজবিজ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ।
বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারার ইতিহাস নিচে বর্ণনা করা হলো:
১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণা শুরু হয়। তবে তা স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতি বিভাগের এমএ কোর্সের একটি পত্র হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমান বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে দর্শন বিভাগে এমএ কোর্সে 'Ethics and Sociology' নামে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ১৯৩৯-৪০ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আওতায় 'Elements of Sociology' শিরোনামে সমাজবিজ্ঞানের কিছু বিষয় পড়ানো হতো। অবশেষে ইউনেস্কো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এবং সহযোগিতায় ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান সর্বপ্রথম একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠন শুরু হয় এবং এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
(ঘ)
উদ্দীপকে যে প্রথিতযশা চিন্তাবিদের কথা বলা হয়েছে তিনি হলেন অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম। বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য, তাই তাকে 'বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক' বলা হয়।
অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিমের অবদানসমূহ নিচে মূল্যায়ন করা হলো:
প্রথমত, ১৯৫৪ সালে ইউনেস্কো বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস বাংলাদেশ সফরে আসার পর অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম এবং অধ্যাপক অজিত কুমার সেন তার সাথে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউনেস্কোর সহযোগিতা কামনা করেন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম 'সমাজবিজ্ঞান' নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়ত, অধ্যাপক নাজমুল করিম হলেন প্রথম বাঙালি চিন্তাবিদ, যিনি সমাজবিজ্ঞানের ভূপ্রকৃতি ও সমাজকাঠামো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন। তার লিখিত 'Changing Society in India, Pakistan, Bangladesh' গ্রন্থটি সমাজবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পুস্তক হিসেবে আজও সমাদৃত। এছাড়া তার লেখা 'The Dynamics of Bangladesh Society' এবং 'সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষণ' গ্রন্থগুলো এই বিষয়ের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তৃতীয়ত, তিনি ও তার ছাত্র-ছাত্রীদের ঐকান্তিক সাধনার ফলেই এদেশে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন ও আলোচনা বিস্তৃত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে বিভাগীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, মনোগ্রাফ লেখার ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ প্রশ্নমালা পূরণের কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি এই বিষয়টিকে মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর করে তোলেন।
পরিশেষে বলা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাবিদ বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অবদান রাখলেও অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিমের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এই বিষয়টিকে একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছে।