(ক) আবর্তনের আশ্রয়বাক্যকে 'আবর্তনীয়' (Convertend) বলা হয়।
(খ) সহানুমানের নিয়ম অনুযায়ী একটি বৈধ যুক্তিতে অবশ্যই তিনটি এবং কেবল তিনটি পদ থাকতে হবে: প্রধান পদ, অপ্রধান পদ এবং মধ্যপদ। প্রতিটি পদ যুক্তিতে দুইবার করে ব্যবহৃত হয়। প্রধান পদ প্রধান আশ্রয়বাক্যে একবার ও সিদ্ধান্তে একবার, অপ্রধান পদ অপ্রধান আশ্রয়বাক্যে একবার ও সিদ্ধান্তে একবার এবং মধ্যপদ উভয় আশ্রয়বাক্যে একবার করে ব্যবহৃত হয়।
সহানুমানের এই নিয়মটি লঙ্ঘন করে যদি কোনো যুক্তিতে তিনটি পদের পরিবর্তে চারটি ভিন্ন পদ ব্যবহার করা হয়, তবে তাকে চতুষ্পদী অনুপপত্তি (Fallacy of Four Terms) বলে। এই অনুপপত্তি ঘটার মূল কারণ হলো, সহানুমানে সিদ্ধান্ত টানার জন্য একটি সাধারণ পদের (মধ্যপদ) প্রয়োজন হয় যা অন্য দুটি পদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। কিন্তু যখন যুক্তিতে চারটি ভিন্ন পদ থাকে, তখন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ সংযোগকারী পদ থাকে না। ফলে পদগুলোর মধ্যে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না এবং সিদ্ধান্তটি অবৈধ হয়ে পড়ে।
(গ) উদ্দীপকে চেয়ারম্যানের ভূমিকা সহানুমানের 'মধ্যপদ' বা 'হেতুপদ' (Middle Term)-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
সহানুমানে মধ্যপদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি এমন একটি পদ যা উভয় আশ্রয়বাক্যে উপস্থিত থাকে কিন্তু সিদ্ধান্তে থাকে না। সহানুমানের সিদ্ধান্তে প্রধান পদ ও অপ্রধান পদের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তা সরাসরি হয় না। মধ্যপদটি প্রথমে প্রধান আশ্রয়বাক্যে প্রধান পদের সাথে এবং পরে অপ্রধান আশ্রয়বাক্যে অপ্রধান পদের সাথে যুক্ত হয়ে একটি যোগসূত্র বা সেতু হিসেবে কাজ করে। এভাবে মধ্যপদের মধ্যস্থতায় দুটি বিচ্ছিন্ন পদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্তে তারা মিলিত হয়, কিন্তু মধ্যপদ নিজে সিদ্ধান্তে স্থান পায় না।
উদ্দীপকে চেয়ারম্যানের ভূমিকাও ঠিক মধ্যপদের মতোই। রবিন ও মুবিন দুই ভাই বিরোধের কারণে আলাদা বসবাস করছিলেন। চেয়ারম্যান সাহেব তাদের মধ্যকার বিরোধ অনুধাবন করে তা নিরসনের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রথমে রবিনের সাথে এবং পরে মুবিনের সাথে পৃথকভাবে আলোচনা করেন। চেয়ারম্যান সাহেব দুই ভাইকেই বোঝাতে সক্ষম হন এবং তাদের মধ্যকার বিরোধের অবসান ঘটান। এর ফলে দুই ভাই আবার একসাথে বসবাস শুরু করেন।
এখানে চেয়ারম্যান হলেন মধ্যপদ, যিনি রবিন (প্রধান পদ) ও মুবিন (অপ্রধান পদ)-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দিয়েছেন। কিন্তু যখন দুই ভাই বিরোধ মিটিয়ে একসাথে বসবাস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, তখন সেখানে চেয়ারম্যানের নিজের কোনো ব্যক্তিগত ভূমিকা বা উপস্থিতি ছিল না। মধ্যপদ যেমন আশ্রয়বাক্যদ্বয়ে সংযোগ ঘটিয়ে সিদ্ধান্তে নিজে বিলুপ্ত হয়ে যায়, চেয়ারম্যানও তেমনি দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে নিজে আড়ালে চলে গেছেন। তাই চেয়ারম্যানের ভূমিকা সহানুমানের মধ্যপদের সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
(ঘ) উদ্দীপকে নির্দেশিত বিষয়টি সহানুমানের গঠন ও প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। নিচে সহানুমানের প্রকৃতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
যে মাধ্যম অবরোহ অনুমানে সিদ্ধান্তটি দুটি পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়, তাকে সহানুমান (Syllogism) বলে। সহানুমানের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
১. মাধ্যম অনুমান: সহানুমান একটি মাধ্যম অনুমান। এর সিদ্ধান্তটি কখনো একটিমাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সরাসরি অনুমিত হয় না, বরং দুটি পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত আশ্রয়বাক্য থেকে যৌথভাবে নিঃসৃত হয়।
২. সিদ্ধান্তের ব্যাপকতা: সহানুমান একটি অবরোহ অনুমান হওয়ায় এর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই আশ্রয়বাক্য থেকে বেশি ব্যাপক হতে পারে না। সিদ্ধান্তটি সাধারণত আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক বা সমব্যাপক হয়。
৩. সাধারণ উপাদানের উপস্থিতি: সহানুমানের আশ্রয়বাক্য দুটিতে একটি সাধারণ উপাদান বা মধ্যপদ থাকে। এই মধ্যপদটি আশ্রয়বাক্য দুটির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে সিদ্ধান্ত গঠনে সাহায্য করে।
৪. অনিবার্য সম্পর্ক: সহানুমানের সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়। আশ্রয়বাক্য দুটি সত্য হলে এবং সহানুমানের নিয়মাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে সিদ্ধান্তটি সত্য হতে বাধ্য।
৫. রূপগত সত্যতা: সহানুমানে মূলত রূপগত সত্যতার (Formal Truth) ওপর জোর দেওয়া হয়। এখানে আশ্রয়বাক্যগুলোকে সত্য বলে ধরে নিয়ে নিয়মসংগতভাবে সিদ্ধান্ত টানা হয়।
উদ্দীপকের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় রবিন ও মুবিনের বিরোধ মিটে যাওয়ার বিষয়টি সহানুমানের মধ্যপদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সাথে হুবহু মিলে যায়। মধ্যপদ ছাড়া যেমন সহানুমানের সিদ্ধান্ত অসম্ভব, তেমনি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতা ছাড়াও দুই ভাইয়ের বিরোধ মেটানো সম্ভব হতো না।
পরিশেষে বলা যায়, সহানুমান হলো একটি সুশৃঙ্খল অবরোহী প্রক্রিয়া যা নির্দিষ্ট নিয়মাবলী এবং মধ্যপদের কার্যকর ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে অনিবার্য সিদ্ধান্ত প্রদান করে।