(ক)
বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক হলেন অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমূল করিম।
(খ)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হয়।
১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সমাজবিজ্ঞান বিভাগ' নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার ব্যাপক দ্বার উন্মোচিত হয়। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বিস্তৃত হয়েছে, সেহেতু বলা যায়, বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অপরিসীম।
(গ)
উদ্দীপকে রফিক সাহেব এমন কিছু চিন্তাবিদের কথা উল্লেখ করেছেন যাদের গবেষণা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি জানতে সহায়ক। এই তথ্যের আলোকে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার পটভূমি ব্যাখ্যা করা হলো।
ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজচিন্তার ইতিহাস প্রায় দু'হাজার বছরের পুরোনো। মৌর্য যুগের কূটনীতিবিদ কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', গুপ্ত যুগের দার্শনিক বাৎসায়নের 'কামসূত্র', সুলতান মাহমুদের সভাসদ ও পারস্যের পণ্ডিত আবু রাইহান আল-বেরুনির 'ভারততত্ত্ব', মুঘল যুগের ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরি' ও 'আকবরনামা' ইত্যাদি গ্রন্থে উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়।
ব্রিটিশ শাসনামলে স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য উইলিয়াম উইলসন হান্টারের সম্পাদনায় সামাজিক তথ্যের আকর গ্রন্থ 'The Imperial Gazetteer' প্রকাশিত হলে উপমহাদেশের সমাজ সম্পর্কিত চিন্তাধারা নতুন গতি লাভ করে। ব্রিটিশদের পাশাপাশি বাঙালি বুদ্ধিজীবীরাও তাদের নানা রচনায় সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও প্রথা-পদ্ধতির ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এসব রচনার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'লোকরহস্য', ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বোধোদয়' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত শিখা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত লেখকদের রচনাও বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল।
উদ্দীপকের রফিক সাহেব মূলত এই চিন্তাবিদদের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন, যাদের চিন্তা-চেতনা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির স্বরূপ জানতে সহায়তা করেছে।
(ঘ)
"উদ্দীপকে সমাজবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে"- উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ নয়।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, আধুনিককালে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে জানতে সমাজবিজ্ঞান কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে এবং এর জ্ঞান দ্বারা যেকোনো সামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব। এগুলো সমাজবিজ্ঞান পাঠের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরলেও তা বিষয়টির সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ নয়।
বস্তুত সমাজবিজ্ঞান পাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা হলো সামাজিক জীবনের কার্যাবলি ও তার কারণ সম্পর্কে যথাযথ এবং পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করা। সমাজের মানুষের আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, মূল্যবোধ, প্রথা ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধানের জন্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন। পরিবার, বিবাহ ও জ্ঞাতিসম্পর্কের ভূমিকা অনুধাবনেও এই বিষয়ের জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়নের মাধ্যমে সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানা যায়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং গোষ্ঠী আচরণ প্রভৃতি সম্পর্কে জানতেও সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য।
পাশাপাশি যেকোনো সামাজিক সমস্যার স্বরূপ উদ্ঘাটন ও সমাধানের পথ রচনায় সমাজবিজ্ঞান সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়নের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন ও স্বরূপ উদ্ঘাটন করা সম্ভব। এছাড়া দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নেও সমাজবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সর্বোপরি, সামাজিক মানুষকে অধিকার ও দায়িত্ববোধে সচেতন করার পাশাপাশি সুনাগরিকের গুণাবলি অর্জনে সমাজবিজ্ঞান সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান যেহেতু সমাজের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান প্রদান করে, সেহেতু সমাজকাঠামো ও মানুষের সমাজজীবন সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জনের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। উদ্দীপকে কেবল কিছু নির্দিষ্ট দিক উল্লেখ করা হয়েছে, সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে ফুটে ওঠেনি।