(ক) সহানুমানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. শুদ্ধ বা অমিশ্র সহানুমান এবং ২. মিশ্র সহানুমান।
(খ) সহানুমানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সহানুমানের সিদ্ধান্তটি সবসময় দুটি আশ্রয়বাক্য থেকে যৌথভাবে অনুমিত হয়। সহানুমান একটি মাধ্যম অবরোহ অনুমান হওয়ায় এর সিদ্ধান্তটি কোনো একটি আশ্রয়বাক্য থেকে এককভাবে আসে না, বরং দুটি আশ্রয়বাক্যের সম্মিলিত অনিবার্য ফল হিসেবে নিঃসৃত হয়।
২. সহানুমানের আশ্রয়বাক্য দুটির মধ্যে একটি সাধারণ বা মধ্যপদ (Middle term) থাকে, যা উভয় আশ্রয়বাক্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। এই মধ্যপদের উপস্থিতির কারণেই আশ্রয়বাক্য দুটির মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
(গ) উদ্দীপকের যুক্তি-১ এ সহানুমানের ‘অব্যাপ্য মধ্যপদজনিত অনুপপত্তি’ (Fallacy of Undistributed Middle) ঘটেছে।
সহানুমানের একটি অন্যতম প্রধান নিয়ম হলো: মধ্যপদকে আশ্রয়বাক্য দুটির মধ্যে অন্তত একবার অবশ্যই ব্যাপ্য হতে হবে। মধ্যপদ যদি কোনো আশ্রয়বাক্যেই ব্যাপ্য না হয়, তবে তা প্রধান পদ ও অপ্রধান পদের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। ফলে সিদ্ধান্তটি অবৈধ হয়ে পড়ে।
উদ্দীপকের যুক্তি-১ টি হলো:
সকল কোকিল হয় কালো (A)
সকল কাক হয় কালো (A)
∴ সকল কাক হয় কোকিল (A)
এই সহানুমানে মধ্যপদ হলো ‘কালো’। আমরা জানি, A (সার্বিক সদর্থক) যুক্তিবাক্যের উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য হলেও বিধেয় পদ অব্যাপ্য থাকে। এখানে প্রধান আশ্রয়বাক্য ‘সকল কোকিল হয় কালো’ এবং অপ্রধান আশ্রয়বাক্য ‘সকল কাক হয় কালো’ উভয়ই A যুক্তিবাক্য। উভয় বাক্যেই মধ্যপদ ‘কালো’ বিধেয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে মধ্যপদ ‘কালো’ কোনো আশ্রয়বাক্যেই ব্যাপ্য হতে পারেনি। মধ্যপদ অব্যাপ্য থাকার কারণে এটি প্রধান পদ ‘কোকিল’ এবং অপ্রধান পদ ‘কাক’ এর মধ্যে কোনো বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি। সুতরাং, সহানুমানের নিয়ম লঙ্ঘিত হওয়ায় এখানে অব্যাপ্য মধ্যপদজনিত অনুপপত্তি ঘটেছে এবং যুক্তিটি অবৈধ হয়েছে।
(ঘ) উদ্দীপকের যুক্তি-২ এবং যুক্তি-৩ এর তুলনামূলক আলোচনা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
যুক্তি-২ এর বিশ্লেষণ:
যুক্তি-২ টি হলো:
সকল মানুষ হয় মরণশীল (A)
কোনো ফেরেশতা নয় মরণশীল (E)
∴ কোনো ফেরেশতা নয় মানুষ (E)
এই সহানুমানে তিনটি পদ রয়েছে: প্রধান পদ ‘মানুষ’, অপ্রধান পদ ‘ফেরেশতা’ এবং মধ্যপদ ‘মরণশীল’।
এখানে প্রধান আশ্রয়বাক্যটি A যুক্তিবাক্য হওয়ায় এর উদ্দেশ্য পদ ‘মানুষ’ ব্যাপ্য এবং বিধেয় পদ ‘মরণশীল’ অব্যাপ্য। অপ্রধান আশ্রয়বাক্যটি E যুক্তিবাক্য হওয়ায় এর উদ্দেশ্য ‘ফেরেশতা’ এবং বিধেয় ‘মরণশীল’ উভয় পদই ব্যাপ্য। সিদ্ধান্তটি E যুক্তিবাক্য হওয়ায় এর উদ্দেশ্য ‘ফেরেশতা’ এবং বিধেয় ‘মানুষ’ উভয় পদই ব্যাপ্য।
সহানুমানের নিয়ম অনুযায়ী, যে পদ আশ্রয়বাক্যে ব্যাপ্য নয়, তা সিদ্ধান্তে ব্যাপ্য হতে পারে না। এখানে ‘মানুষ’ পদটি প্রধান আশ্রয়বাক্যে ব্যাপ্য ছিল এবং সিদ্ধান্তে এসেও ব্যাপ্য হয়েছে। মধ্যপদ ‘মরণশীল’ অপ্রধান আশ্রয়বাক্যে ব্যাপ্য হয়েছে। সুতরাং, এই যুক্তিতে সহানুমানের সকল নিয়ম যথাযথভাবে পালিত হয়েছে। তাই যুক্তি-২ একটি বৈধ সহানুমান।
যুক্তি-৩ এর বিশ্লেষণ:
যুক্তি-৩ টি হলো:
সকল মানুষ হয় জ্ঞানী (A)
কোনো পাখি নয় মানুষ (E)
∴ কোনো পাখি নয় জ্ঞানী (E)
এই সহানুমানে প্রধান পদ ‘জ্ঞানী’, অপ্রধান পদ ‘পাখি’ এবং মধ্যপদ ‘মানুষ’।
এখানে প্রধান আশ্রয়বাক্যটি A যুক্তিবাক্য হওয়ায় এর বিধেয় পদ ‘জ্ঞানী’ অব্যাপ্য। কিন্তু সিদ্ধান্তটি E যুক্তিবাক্য হওয়ায় এর বিধেয় পদ ‘জ্ঞানী’ ব্যাপ্য হয়ে গেছে। সহানুমানের নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয়বাক্যে অব্যাপ্য কোনো পদকে সিদ্ধান্তে ব্যাপ্য করা যায় না। এই নিয়ম লঙ্ঘন করে আশ্রয়বাক্যের অব্যাপ্য প্রধান পদ ‘জ্ঞানী’ কে সিদ্ধান্তে ব্যাপ্য করায় এখানে ‘অবৈধ প্রধান পদজনিত অনুপপত্তি’ (Fallacy of Illicit Major) ঘটেছে।
তুলনামূলক মূল্যায়ন:
যুক্তি-২ এবং যুক্তি-৩ এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো বৈধতার ক্ষেত্রে। যুক্তি-২ সহানুমানের ব্যাপ্যতার নিয়ম মেনে চলায় এটি একটি সম্পূর্ণ বৈধ যুক্তি। অন্যদিকে, যুক্তি-৩ সহানুমানের নিয়ম লঙ্ঘন করে অব্যাপ্য প্রধান পদকে সিদ্ধান্তে ব্যাপ্য করায় এটি অবৈধ এবং অনুপপত্তিগ্রস্ত।