ক.
সমুদ্রের উপরিভাগের পানিরাশির একটি নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে একস্থান হতে অন্যস্থানে প্রবাহিত হওয়াকে সমুদ্রস্রোত বলে ।
খ.
পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়। এ আবর্তনের সাথে সমুদ্রের পানিও পশ্চিম হতে পূর্বে আবর্তিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে।
ফেরেলের (আমেরিকান আবহাওয়াবিদ) সূত্রানুসারে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় ।
গ.
উদ্দীপকে 'ক' তে যে মহাসাগরের ইঙ্গিত রয়েছে সেটি, আটলান্টিক মহাসাগর নিচে আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর অংশের স্রোতগুলো ব্যাখ্যা করা হলো-
i. উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ : পশ্চিমা বায়ু দ্বারা তাড়িত হয়ে উপসাগরীয় স্রোতের যে শাখা আটলান্টিকের উত্তর দিকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও নরওয়ের উপকূলের দিকে যায়, তা উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ নামে পরিচিত 1
ii. ক্যানারি স্রোত : উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের একটি শাখা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ‘পর্তুগালের পশ্চিমে উপকূলের দিকে যায়। পরে দক্ষিণে বেঁকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয়। উপসাগরীয় স্রোত উষ্ণ হলেও উত্তর মহাসাগরের দিক থেকে আগত সুমেরু স্রোতের একটি শাখা অন্তঃস্রোতরূপে এর সাথে মিলিত হয়ে স্রোতটিকে শীতল স্রোতে পরিণত করে।
iii. উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত : ক্যানারি স্রোত উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বেঁকে নিরক্ষরেখার উত্তর দিয়ে সোজা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এই উষ্ণ স্রোতটি উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত নামে পরিচিত।
iv. বাহামা স্রোত : উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখাটি বাহামা দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে উপসাগরীয় স্রোতের সাথে মিলিত হয় তা বাহামা স্রোত নামে পরিচিত।
. গিvনি স্রোত : নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে এসে ক্যানারি স্রোতের একটি শাখার সাথে মিলিত হয়ে গিনি উপসাগরে প্রবেশ করে। গিনি স্রোত নাম নিয়ে তা নিরক্ষরেখা ও গিনি উপসাগর অতিক্রম করে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল দিয়ে বেঙ্গুয়ালা স্রোতের পূর্বপার্শ্বে বিলীন হয়ে যায় ।
vi. পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত : গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে সুমেরু স্রোতের দুটি শাখা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এরা যথাক্রমে পূর্ব গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত হিসেবে পরিচিত। vii. ল্যাব্রাডর স্রোত : পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত কানাডার ল্যাব্রাডর উপদ্বীপের নিকট মিলিত হয়ে ল্যাব্রাডর স্রোত নামে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট দুর্ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি শাখা উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে এবং অপর শাখা উপসাগরীয় স্রোতের নিচ দিয়ে প্রবাহিত।
viii. সুমেরু 'স্রোত : সুমেরু মহাসাগর হতে আগত এ স্রোত গ্রিনল্যান্ডের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ছাড়াও অন্তঃস্রোতরূপে উত্তর আটলান্টিকের নিচ দিয়ে ক্যানারি স্রোতের সাথে মিলিত হয়ে সেটাকে শীতল স্রোতে পরিণত করে।
x. ইরমিiনজার স্রোত : সুমেরু সাগর থেকে আইসল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূল দিয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে উত্তর আটলান্টিক স্রোতের ঘূর্ণাবর্তে এটি শেষ হয়ে যায়।
x. নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত : উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের মধ্যবর্তী স্থানে নিরক্ষরেখার ঈষৎ উত্তরে সোজা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে যে স্রোত প্রবাহিত হয় তাকে নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত বলে।
ঘ.
উদ্দীপকে 'খ' তে ভারত মহাসাগরের কথা বলা হয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় স্রোতগুলো হলো— গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন মৌসুমি স্রোত, সোমালি, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার স্রোত, আগুলহাস স্রোত, পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোত প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মানবজীবনে ভারত মহাসাগরের স্রোতগুলোর প্রভাব আলোচনা করা হলো-
গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন মৌসুমি স্রোতের প্রভাব : উত্তর ভারত মহাসাগরের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোত সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন । এ উপসাগরীয় স্রোত : দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের একটি শাখা। স্রোতের প্রভাবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। দক্ষিণ নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল দিয়ে। এশিয়ার সম্পূর্ণ কৃষিকাজ এই মৌসুমি স্রোতপ্রবাহ ও এর কারণে ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রবেশ করে। সেখানে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তন একটি শাখা এসে মিলিত হয়। এই মিলিত স্রোত মেক্সিকো সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের কৃষির একটা বড় অংশ এবং মৎস্য প্রজনন বর্ষার ওপর নির্ভরশীল ।
সোমালি, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার ও আগুলহাস স্রোতের প্রভাব : আফ্রিকার উপকূলে উষ্ণ সোমালি, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার ও আগুলহাস স্রোত প্রবাহিত থাকার কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং এ এলাকাগুলো কৃষিকার্যে যথেষ্ট উন্নত। এই বৃষ্টিপাতের কারণে উক্ত এলাকাগুলোতে বর্ষজীবী উদ্ভিদ জন্মাতে দেখা যায়। উষ্ণ স্রোতের গতিপথে সামুদ্রিক জাহাজগুলোও দ্রুত যাতায়াত করতে পারে। উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত থাকার কারণে মিয়ানমার, মালয়েশিয়ায় ও সুমাত্রা উপকূলের জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং উপকূলীয় এলাকার বৃষ্টিপাতে স্রোতগুলো প্রভাববিস্তার করে ।
পশ্চিম অস্ট্রেলীয় স্রোতের প্রভাব : পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোতটি পর্যায়ক্রমে উষ্ণতাপ্রাপ্ত হয় বিধায় ঐ উপকূলে বৃষ্টিপাত কম হয় । ফলে উপকূলীয় এলাকায় জলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্রোতের উত্তরাংশে উপকূল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি বলে ঘন বনাঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে।
নিরক্ষীয় স্রোতের প্রভাব : উষ্ণ দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতপথে অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে জাহাজ অফ্রিকার পথে এবং আফ্রিকা থেকে নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত কিংবা গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোত পথে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল করে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারত মহাসাগ্রীয় স্রোতগুলো উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাববিস্তার করে থাকে ।