ক.
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।
খ.
১৯৬৮ সালে দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর ৬-দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল যে, অভিযুক্তরা ভারতের আগরতলায় বসে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করছেন। তবে এর প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে 'রাষ্ট্রদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নস্যাৎ করা।
গ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত ভাষণের সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মিল রয়েছে। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। যার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। যা ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন রোজ রবিবার লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে তার ভাষণ শুরু করেন। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, "আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়। বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলা মানুষ অধিকার চায়।” তিনি আরো বলেন, ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি, ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোল।। এনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, "তিনি বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।" তিনি বলেন, "আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।" বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধেরপ্রস্তুতির জন্য তৈরি হতে ঘোষণা দিলেন" প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। উদ্দীপকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে হো চি মিন কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি এবং অনুপ্রেরণার সাথে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত ৭ মার্চের ভাষণের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। কেননা হো চি মিনের ভাষণের মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যাপক অনুপ্রেরণা জোগায়।
ঘ.
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। বিশ্লেষণ করা হলো-
উদ্দীপকে বলা হয়েছে , হো চি মিন ভিয়েতনাম যুদ্ধের পূর্বে জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণে তাদের যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশনা দেয়। যার মাধ্যমে ভিয়েতনামের মানুষ যুদ্ধ জয়ের মূলমন্ত্র পেয়ে যায় এবং যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অনুরূপ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ফলে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা লাভ করে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ৭ মার্চ একটি ইতিহাস। ৭ই মার্চ বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ৭ই মার্চের ভাষণ লক্ষকোটি জনতার মাঝে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য একটি করে ইতিহাস। এ ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মার্কিন গণতন্ত্রের পথনির্দেশ আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতির বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে মুক্তি লাভের শপথ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা লাভ করে। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের ৩০ তারিখে ইউনেস্কো ৭ই মার্চের ভাষণকে ডকুমেন্টারি হেরিটেজ (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ডে ইন্টার ন্যাশনাল রেজিস্টারে ৭ই মার্চের ভাষণসহ এখন পর্যন্ত ৪২৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগৃহীত হয়েছে।
তাই উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, হো চি মিনের ভাষণের মতো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগায়। যার প্রেক্ষিতে তারা স্বাধীনতার পবিত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। তাই ৭ই মার্চের ভাষণ একটি ইতিহাস।