ক.
মাতৃভূমির প্রতি মমত্ববোধ ও ভালোবাসাই হচ্ছে দেশপ্রেম।
খ.
জাতি বলতে একটি বিশেষ চেতনার দ্বারা ঐক্যবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত জনসমষ্টিকে বোঝায়। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমষ্টি যারা ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি এবং ঐতিহ্য বন্ধনে আবদ্ধ তাদের জাতি বলে। একটি জাতির মধ্যে সাধারণত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য বিদ্যমান থাকে। একটি জনসমাজ জাতীয়তা বোধের উদ্বুদ্ধ হলে এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তিতে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করলে বা স্বাধীন হলে পৌরনীতির দৃষ্টিকোণে তা জাতিতে পরিণত হয়।
গ.
উদ্দীপকে জাতীয়তার যে উপাদানটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে তা হলো ভাষাগত ঐক্য।
সাধারণভাবে জাতীয়তা বলতে রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন এমন জনসমষ্টিকে নির্দেশ করে যারা একই বংশ, ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, সাহিত্য, আদর্শ ঐতিহ্য, আচার ও রীতিনীতি দ্বারা ঐক্যবদ্ধ। উদ্দীপকে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে তারা বাংলাদেশি বাঙালি যারা অনুরূপভাবে গঠিত পাকিস্তানি ভিন্নভাষী জনসমষ্টি থেকে আলাদা মনে করত।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আচার ও রীতিনীতির ধারক ও বাহক। যখন একটি জনগোষ্ঠী একই ভাষায় কথা বলে, তখন তারা একই ধরনের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বন্ধন সৃষ্টি করে যা জাতীয়তাবোধকে আরও দৃঢ় করে। ভাষাগত ঐক্য একটি জাতিকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। বাংলাভাষী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষার মাধ্যমে তাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিল। ভাষার এই ঐক্য তাদের মধ্যে একটি আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তোলে, যা তাদেরকে একটি আলাদা জাতি হিসেবে একত্রিত হতে উৎসাহিত করে। এই ঐক্যই স্বাধীনতা সংগ্রামে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকে ভাষাগত ঐক্য জাতীয়তা গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
ঘ.
'জাতি গঠনের ক্ষেত্রে উক্ত উপাদানটি একমাত্র উপাদান নয়'-মন্তব্যটির সাথে আমি একমত।
উদ্দীপকে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভাষাগত ঐক্যের বিষয়টিকে মুখ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে যা জাতি গঠনের ক্ষেত্রে একমাত্র উপাদান নয়। জাতি গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় সংঘবদ্ধ একটি রাজনৈতিক জনসমষ্টি যারা নিজেদেরকে অন্য জাতিগোষ্ঠীর থেকে আলাদা মনে করে। এই জাতিগোষ্ঠীর ধারণা সংহত করতে বংশ, ভৌগোলিক অবস্থান, আদর্শ, ধর্ম, ঐতিহ্য, আচার ও রীতিনীতি প্রভৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোনো জনসমষ্টি যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে, তখন তাদের মধ্যে একটি আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা গড়ে ওঠে যা তাদের মধ্যে পারস্পরিক নির্রশীলতা ও একাত্মতা সৃষ্টি করে। এটা কালক্রমে জাতি গঠনের দিকে ধাবিত করে। যারা একই ধরনের রাজনৈতিক বন্ধনে দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ থাকে তাদের ভেতরে স্বভাবগতভাবে এক ধরনের ঐক্যবোধের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐক্যই মুখ্য ভূমিকা পালন করে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে। গ্রেট ব্রিটেনের অঙ্গরাজ্যগুলো একই জাতীয়তাবোধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে রাজনৈতিক ঐক্যের বদৌলতে। ধর্মীয় ঐক্যও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মই জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তিতে ধর্ম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। একটি জনগোষ্ঠীর অতীত স্মৃতি ও ঐতিহ্য তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে, তাদের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও বীরত্বগাঁথা অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। এছাড়া বংশগত ঐক্য, অর্থনৈতিক ঐক্য, মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য, সমস্বার্থ প্রভৃতিও একটি জনগোষ্ঠীর ভেতরে 'ঐক্যের ধারণার জন্ম দেয় যা জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে।