ক.
লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় ছিলেন।
খ.
১৯১৯ খ্রিঃ বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয় এবং দুই বাংলার মিলন ঘটে। এই ঘটনায় মুসলিম সমাজ সরকারের ওপর প্রবল ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সুলতান তথা সর্বোচ্চ মুসলিম ধর্মগুরু খালিফা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করলে ভারতেও মুসলমান। নেতৃত্ব ইংরেজের বিরুদ্ধে সােচ্চার হন। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের পর মুসলিম লীগেরুণ সদস্যদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে লীগ ও জাতীয় কংগ্রেস পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারে। ১৯১১ খ্রিঃ বােম্বাই শহরে লীগ ও কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। উভয় দলের নেতৃবৃন্দ হিন্দু ও মুসলমান ঐক্য দ্বারা জাতীয় আন্দোলন গড়ে তােলার আহ্বান জানান। এরই পরিণতি হিসাবে ১৯১৬ খ্রিঃ জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ লক্ষ্ণৌ চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
গ.
উদ্দীপকের ঘটনাটি পাঠ্যবই এর বঙ্গভঙ্গের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। নিচে ব্যাখ্যা করা হলোঃ
উদ্দীপকে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলা নিয়ে রাজশাহী বিভাগ। একটি প্রশাসনিক ইউনিটের অধীনে রেখে এত বড় বিভাগে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গ্রহণ করে ৮টি জেলা নিয়ে আলাদা বিভাগ গঠন করার। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুর বিভাগ নামে নতুন একটি বিভাগ গঠিত হয়। ফলে ঐ অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে ১ম বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। বাংলা বিভক্ত করে ফেলার ধারনাটি অবশ্য কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও ওড়িশা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারী প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই।
সুতরাং বলা যায় যে, উদ্দীপকের ঘটনার সাথে পাঠ্যবই এর "বঙ্গভঙ্গ" ঘটনার মিল রয়েছে।
ঘ.
না। বিষয়টির পিছনে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কারণই দায়ী নই। নিম্মে বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করা হলঃ
প্রশাসনিক কারণঃ বঙ্গভঙ্গের মূল কারণ ছিল মূলত প্রশাসনিক সংষ্কার পরিকল্পনা। বাংলা বিশাল প্রদেশ হওয়ায় এর শাসনভার ছিল কষ্টসাধ্য। বাংলার আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল। লর্ড কার্জন একে প্রশাসনিক সংস্কার নামে অভিহিত করেন।
রাজনৈতিক কারণঃ ভারতীয় উপমহাদেশে পাশ্চাত্যে শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। তখন এসব আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। ঢাকাকে রাজধানী করে সরকার আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করে। এছাড়া ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের পেছনে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যেমন:
ক. জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নস্যাৎ করা: ১৮৮৫ সালে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ নামক একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে সমগ্র ভারতে বিশেষ করে ‘বাংলা প্রেসিডেন্সিতে’ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রতে পরিণত হয়। এ আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা শহর। সুচতুর ইংরেজ সরকার এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ এবং আন্দোলনকারীদের মেরুদন্ড- ভেঙ্গে দেয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গ করতে উদ্যোগী হয়। ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি অবলম্বন করে।
খ. ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি বাস্তবায়ন: ব্রিটিশরা প্রথম থেকেই এই উপমহাদেশে ভাগ কর শাসন কর নীতিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের শাসন ও ভোগের প্রয়োজনে যেকোন সময় বিভিন্ন প্রদেশ বিভক্ত করত।
গ. মুসলমানদের দাবি: নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের সুযোগ পাবে। হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবিত কলকাতার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিভর্রশীলতা হ্রাস পাবে। মুসলমানরা চাকরি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নতি লাভ করতে পারবে।
অর্থনৈতিক কারণঃ বঙ্গভঙ্গের পূর্বে যাবতীয় শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্যি, অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি কলকাতার কেন্দ্রিভূত ছিল। ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা সর্বত্রই পিছিয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ মুসলমান জনগণ তখন ভাবতে শুরু করে যে, বঙ্গভঙ্গ হলে তারা অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জনের সুযোগ পাবে।
সামাজিক কারণঃ ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলমান সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের প্রতি উদারনীতি এবং মুসলমানদের প্রতি বৈরী নীতি অনুসরণ করত। মুসলমানরা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন একটি দরিদ্র, রিক্ত ও নিঃস্ব সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। সুতরাং লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গবঙ্গের চিন্তা-ভাবনা শুরু হলে পূর্ববাংলার মুসলমান সম্প্রদায় স্বভাবতই এর প্রতি সমর্থন জানায়। বঙ্গবঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মুসলমানগণ তাদের হারানো প্রভাব-প্রতিপত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বঙ্গভঙ্গের জন্য শুধুমাত্র প্রশাসনিক কারণই দায়ী না।