ক.
সাধারণভাবে পরিবর্তন বলতে কোনো কিছুর পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে নতুন বা ভিন্ন অবস্থায় রূপান্তর হওয়াকে বোঝায়।
খ.
প্রগতি হলো সমাজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী পরিবর্তন, আর বিবর্তন হলো কোনো কিছুর ধীর, ধারাবাহিক ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। প্রগতি ও বিবর্তন উভয়েই সামাজিক পরিবর্তনের রূপ হলেও এদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিবর্তন হলো একটি স্বয়ংক্রিয় ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা ভালো বা মন্দ যেকোনো দিকেই ধাবিত হতে পারে। কিন্তু যখন এই বিবর্তনের ধারা সমাজের মানুষের জন্য কল্যাণকর, ইতিবাচক ও কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে, তখন তাকে প্রগতি বলা হয়। অর্থাৎ, সমাজের কাঙ্ক্ষিত ও গঠনমূলক বিবর্তনই হলো প্রগতি। বিবর্তন ছাড়া প্রগতি সম্ভব নয়, কারণ প্রগতি মূলত বিবর্তনেরই একটি সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক রূপ।
গ.
উদ্দীপকের সামাজিক পরিবর্তনে মূলত প্রযুক্তিগত উপাদান এবং শিক্ষাগত উপাদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
উদ্দীপকে সমাজ গবেষক অরুণ সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য কলকারখানা স্থাপন ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের কথা বলেছেন, যা সমাজ পরিবর্তনের একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উপাদানকে নির্দেশ করে। আবার তিনি কম্পিউটার ও মোবাইল সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবসম্পদ গড়ে তোলার কথা বলেছেন, যা মূলত আধুনিক শিক্ষাগত উপাদানেরই অংশ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রযুক্তিগত আবিষ্কার ও তার ব্যবহার সমাজকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। কলকারখানা ও যন্ত্রের ব্যবহার মানুষের উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়, সমাজ কৃষিভিত্তিক থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়। অন্যদিকে, আধুনিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ মানুষকে দক্ষ করে তোলে, যা সমাজের মানুষের চিন্তাধারা ও জীবনবোধে পরিবর্তন আনে। উদ্দীপকের শেষাংশে পৃথিবী হাতের মুঠোয় আসার যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা মূলত তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলেই সম্ভব হয়েছে। তাই বলা যায়, এখানে প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সম্মিলিত প্রভাবকেই সমাজ পরিবর্তনের মূল উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ঘ.
উদ্দীপকে বর্ণিত যান্ত্রিকীকরণ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সামাজিক পরিবর্তনগুলো একটি দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি বা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
উদ্দীপকে গবেষক অরুণ সরকার বলেছেন, দেশ বদলাতে হলে কলকারখানা স্থাপন, যান্ত্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে বর্তমান পৃথিবী যেমন মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে, তেমনি এই পরিবর্তনগুলো সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা প্রকৃত উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
যান্ত্রিকীকরণ ও কলকারখানা স্থাপনের ফলে সমাজে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং দেশের মোট উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি সমাজ যখন সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক শিল্পভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও কম্পিউটার নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলে দেশের পরনির্ভরশীলতা কমে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। উন্নত যোগাযোগ ও প্রযুক্তির কারণে মানুষ বিশ্বায়নের সুবিধাগুলো সহজেই কাজে লাগাতে পারে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে মজবুত করে।
সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, সমাজ সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তন যখন প্রযুক্তিনির্ভর ও উৎপাদনমুখী হয়, তখন তা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি—সমাজ পরিবর্তনের এই আধুনিক রূপগুলো কেবল সমাজকে আধুনিকই করে না, বরং টেকসই ও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথকে সুগম করে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, উদ্দীপকে নির্দেশিত সামাজিক পরিবর্তনগুলোই হলো প্রকৃত উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক।