ক.
একটি নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ব-নির্ধারিত কতগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ও সচেতন ব্যবহারকে উন্নয়ন পরিকল্পনা বলে।
খ.
কোনো দেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার সকল বাস্তবায়নের জন্য সঠিক তথ্য ও উপাত্ত একান্ত প্রয়োজন। কারণ প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত নির্ভুল না হলে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয় না এবং তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদ, বিভিন্ন দ্রব্য ও সেবাকর্ম উৎপাদনের পরিমাণ, জনসংখ্যা, শ্রমশক্তি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপাত্ত প্রায়ই পাওয়া যায় না। এ জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
গ.
উদ্দীপকে বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। যা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
বাংলাদেশ রূপকল্প-২০২১ (ভিশন-২০২১) এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা [এমজিডি (মিলেনিয়াম গোলস ডেভেলপমেন্ট)] অর্জনের জন্য বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা রূপকল্প ২০২১ প্রণীত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ মেয়াদের জন্য যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে তা বাংলাদেশের ষষ্ঠ পঞ্চ- বার্ষিক পরিকল্পনা বলে পরিচিত।
ষষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো- একটি ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন; পরিবেশবান্ধব ও অনুকূল শিল্পায়ন কৌমল নীতি গ্রহণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো সৃষ্টি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি। এসব ছাড়াও টেকসই মানব উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ,বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ ইত্যাদিও হলো এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সাতটি প্রধান ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত ষষ্ঠ পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রাসমূহ হলো- উৎপাদন, আয় সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি।
ষষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা উন্নয়ন কৌশলও রয়েছে; এগুলো হলো- উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আঞ্চলিক সুষম উন্নয়ন, আয় বৈষম্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদারকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণমূলক উন্নয়ন পদ্ধতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
ঘ.
উদ্দীপকে বাংলাদেশের ষষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা সফল করার জন্য সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। উদ্দীপকের আলোকে তার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হলো-
১. নতুন নতুন প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব প্রদান: ষষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনার
প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ পূরণ ও লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের জন্য প্রেক্ষিতে পরিকল্পনার অন্তর্গত ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের প্রচেষ্টা চালানো হবে। এক্ষেত্রে আইসিটি ব্যবহারের বিষয়টিও সহায়ক বিষয় বলে বিবেচিত হবে। তাছাড়া সকল ইউনিয়ন পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধাসহ টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপন, সকারের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এবং সকল জেলায় ই-গভর্নেন্স চালু, সমগ্র দেশে ওয়্যারলেস ব্রড ব্যান্ড প্রবর্তন ইত্যাদিও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করে তুলবে।
২. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: এ উদ্দেশ্যে খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন এবং কৃষিক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিকূল প্রভাব হ্রাস করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এক্ষেত্রে গৃহীতব্য প্রধান পদক্ষেপগুলো হলো: উপকূল এলাকাসহ দেশের সর্বত্র বনভূমি আচ্ছাদন বৃদ্ধি, দূষণমুক্ত বায়ু নিশ্চিতকরণ, নদীর পানিতে শিল্পবর্জ্য মিশ্রণ প্রতিরোধ, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ।
৩. লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ: পরিকল্পনায় সমগ্র উৎপাদন কর্মকাণ্ডে পুরুষের সাথে নারীদেরকেও সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে গৃহীতব্য পদক্ষেপগুলো হলো: মধ্যবর্তী শিক্ষান্তরে পুরুষ-নারী অনুপাত বর্তমান ১০০:৩২ থেকে ১০০:৬০ এ উন্নীতকরণ, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়স কাঠামোয় শিক্ষিত পুরুষ নারী অনুপাত বর্তমানের ১০০:৮৫ থেকে ১০০:১০০ তে উন্নীত করা। এর ফলে দেশে সমগ্র মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
৪. পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) শক্তিশালীকরণ: পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য পিপিপি শক্তিশালীকরণের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। এর ফলে দেশের বড় বড় ও ব্যয় বহুল উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ মালিকানা, উদ্যোগ ও পুঁজি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এ উদ্যোগ অর্থনীতি বৃহৎ ধাক্কা সৃষ্টি করবে যার ফলে উন্নয়নে গতি আসবে।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত পরিকল্পনা তথা ষষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা সফল করার জন্য গৃহীত সরকারি পদক্ষেপসমূহ যথেষ্ট কার্যকর। পদক্ষেপগুলো পরিকল্পনাটির সফল বাস্তবায়নের আশা সঞ্চার করে।