ক.
আব্বাসি বংশ প্রতিষ্ঠা পায় জাবের যুদ্ধের মাধ্যমে ।
খ.
আব্বাসি খিলাফতের পতনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল মোঙ্গল নেতা হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ ।
১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মোঙ্গল নেতা হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করেন । মোঙ্গল বাহিনী ৪০ দিন ধরে অবরোধ চালায় এবং তারা বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড ও জ্বলন্ত অগ্নি নিক্ষেপের মাধ্যমে নগরীর দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে। নিরুপায় খলিফা মুসতাসিম হালাকু খানের নিকট আত্মসমর্পণ করে প্রাণভিক্ষা চান। কিন্তু হালাকু খান অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে খলিফা ও বাগদাদের ২০ লক্ষ জনসংখ্যার ১৬ লক্ষ মানুষকেই হত্যা করে ।
গ.
উদ্দীপকে বর্ণিত সাম্রাজ্যের অর্থাৎ আব্বাসিদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে, অসামান্য অবদান রয়েছে।
আব্বাসিদের শাসনামলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে । এজন্য ঐতিহাসিকেরা এ শাসনামলকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আব্বাসি শাসকগণ পৃথিবী র বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ভাষার মৌলিক গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে অনুবাদের মাধ্যমে চিকিৎসা, দর্শন, গণিত শাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, ভূগোল, ইতিহাসসহ জ্ঞান- বিজ্ঞানের নানা শাখায় অসামান্য অবদান রেখে গেছে।। উদ্দীপকেও এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল মুসলিম শাসনব্যবস্থার স্বর্ণযুগ। আব্বাসি বংশের শাসকগণই অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। এ সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়। খলিফা হারুন-অর-রশীদের আমলে বাগদাদে একটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব হাসপাতালে মহিলাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও ডিসপেনসারি ছিল। ইবনে সিনা ছিলেন এ সময়কার জগদ্বিখ্যাত চিকিৎসক ও দার্শনিক। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বাইবেল খ্যাত আল কানুন ফিত তিব্ব' রচনা করেন। দর্শন শাস্ত্রেও আব্বাসিরা অসামান্য অবদান রাখেন। আল কিন্দি, আল ফারাবি, ইমাম গাজালি ও ইবনে সিনা ছিলেন এ সময়কালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। আল কিন্দি গ্রিক দর্শনের সাথে মুসলিম দর্শনের সামঞ্জস্য বিধান করেন। আল ফারাবিকে ইউরোপীয়গণ প্রাচ্যের এরিস্টটল নামে আখ্যায়িত করত। এ ছাড়া গণিত শাস্ত্রে আব্বাসি শাসনামলে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে। এ সময় বিখ্যাত গণিত শাস্ত্রবিদ আল খাওয়ারিজমি ‘দি নিউমরো ইনডিকো' গ্রন্থে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানীদের সংখ্যাতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞানদান করেন । তিনিই প্রথম শূন্য (০) এর ব্যবহার করেন। তার প্রণীত 'কিতাবুল জবর ওয়াল মুকাবালাহ' গ্রন্থ থেকেই অ্যালজেবরা বা বীজগণিতের উৎপত্তি ঘটেছে। জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির উন্নতিতেও আল খাওয়ারেজমি অপরিসীম অবদান রাখেন। এছাড়াও ভূগোল শাস্ত্র, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতিতে আব্বাসি শাসনামলে অগ্রগতি সাধিত হয়। তাই বলা যায়, আব্বাসি শাসনামলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় প্রত্যেকটি শাখায় অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল ।
ঘ.
উদ্দীপকের সাম্রাজ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আব্বাসি সাম্রাজ্যে ব্যাপক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি হয়েছিল ।
আব্বাসিরা সুদীর্ঘ প্রায় ৫০০ বছরের (৭৫০-১২৫৮) রাজত্বকালে জ্ঞান - বিজ্ঞান, প্রশাসন, রাজস্ব, বিচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে । যা আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে। যদিও সমাজে ঋদের প্রচলন ছিল। উদ্দীপকেও এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকে অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম সাম্রাজ্যের কথা বলা হয়েছে। যেখানে আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও মদপান ছিল সমাজের সর্বস্তরে প্রচলিত। এ থেকে বোঝা যায়, উদ্দীপকে আব্বাসি শাসনামলকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ এ শাসনামলে আর্থ- সামাজিক অবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে সমাজে মদের বেশি প্রচলন ছিল। এ যুগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এ যুগে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। এ শাসনামলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। এ সময় বাগদাদ, বসরা, সিরিয়া, কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়া দ্রুত স্থল ও নৌবাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ ছাড়া এসময় মুসলিম বণিকেরা চীনের সাথে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করেছিল। বাণিজ্য হতো মূলত সিল্ক বস্ত্র নিয়ে। ফলে চীনের ক্যান্টন প্রদেশের সাথে বাগদাদের এক সুদৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাছাড়া পশ্চিম দিকে মরক্কো ও স্পেনের সাথেও মুসলমানদের বাণিজ্যিক তৎপরতা এসময় বৃদ্ধি পায়। এ আমলে কুটির শিল্পেরও ব্যাপক বিকাশ সাধিত হয় । ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়। এ ছাড়া আব্বাসিদের বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার প্রবর্তন ছিল যুগান্তকারী। এ সময় আরব আভিজাত্যের অহমিকার অবসান ঘটে এবং আরব-অনারব বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয় । আব্বাসি যুগে নারীরা সমাজে উচ্চ স্থানের অধিকারী ছিলেন। তারা স্বাধীনতা ভোগ করতেন ।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, আব্বাসি শাসনামলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার অসামান্য উন্নতি ঘটেছিল ।