ক.
মধ্যযুগের ইউরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ধর্মীয় কার্যাবলি পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণিকে যাজক শ্রেণি বলা হয়।
খ.
দাসপ্রথা হলো এমন এক চরম অসম ও অমানবিক সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে একদল মানুষ অন্য একদল মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো।
দাসপ্রথা পৃথিবীর প্রাচীন বৈষম্যভিত্তিক শ্রেণিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা। দাসপ্রথানির্ভর সমাজে দাসদের কোনো নাগরিক বা মানবিক অধিকার ছিল না। তারা তাদের মালিকের অধীনে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য থাকত এবং মালিক তাদের কেনাবেচা বা হস্তান্তর করতে পারত। বস্তুত দাসপ্রথা ছিল একটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ভর সমাজব্যবস্থা। দাসপ্রথায় দাসদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে এই প্রথা অত্যন্ত প্রবল ছিল, যা সমাজকে মালিক ও দাস- এই দুই প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিল।
গ.
উদ্দীপকের ছকটি আমার পঠিত বইয়ের সামাজিক ব্যবস্থার 'রাষ্ট্র' নামক প্রত্যয়টিকে নির্দেশ করে।
রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমষ্টির দ্বারা গঠিত এবং যার একটি সার্বভৌম সরকার থাকে। অধ্যাপক গার্নারের মতে, রাষ্ট্র হলো এমন এক জনসমষ্টি যারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত এবং যার একটি সুসংগঠিত সরকার আছে।
রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য চারটি অপরিহার্য উপাদান প্রয়োজন। রাষ্ট্রের উপাদানসমূহ হলো- জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। জনসমষ্টি হলো রাষ্ট্রের প্রাথমিক উপাদান, কারণ মানুষ ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বলতে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানাকে বোঝায়, যা জল, স্থল ও আকাশপথ নিয়ে গঠিত হতে পারে। সরকার হলো রাষ্ট্রের সেই যন্ত্র বা সংস্থা যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতা, যা রাষ্ট্রকে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখে। উদ্দীপকের ছকে বর্ণিত মতবাদগুলো মূলত এই রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি ব্যাখ্যা করারই বিভিন্ন তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, উদ্দীপকের ছক দ্বারা রাষ্ট্র নামক রাজনৈতিক প্রত্যয়কেই নির্দেশ করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও উপাদান বিদ্যমান।
ঘ.
রাষ্ট্রের উৎপত্তির ক্ষেত্রে উদ্দীপকের 'গ' (মাতৃতান্ত্রিক মতবাদ), 'ঙ' (সামাজিক চুক্তি মতবাদ) ও 'চ' (বিবর্তনমূলক মতবাদ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাষ্ট্রের উৎপত্তির ব্যাখ্যায় এই মতবাদগুলো ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। মাতৃতান্ত্রিক মতবাদ আদিম রক্ত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রের সূচনা ব্যাখ্যা করে, সামাজিক চুক্তি মতবাদ মানুষের সচেতন রাজনৈতিক সমঝোতাকে গুরুত্ব দেয় এবং বিবর্তনমূলক মতবাদ রাষ্ট্রকে একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে গণ্য করে।
উদ্দীপকের 'গ' বা মাতৃতান্ত্রিক মতবাদ অনুযায়ী, আদিম সমাজে পরিবারের প্রধান ছিলেন মাতা এবং বংশ পরিচয় মায়ের নামে চলত, যা কালক্রমে রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে। 'ঙ' বা সামাজিক চুক্তি মতবাদ (হবস, লক ও রুশো প্রদত্ত) অনুযায়ী, মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে অরাজকতা এড়াতে নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, 'চ' বা বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদ, যা মনে করে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ তৈরি হয়নি। বরং রক্ত সম্পর্ক, ধর্ম, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক চেতনার বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের এই আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। উদ্দীপকের এই তিনটি মতবাদ রাষ্ট্রের বিবর্তনের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাকে নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিবর্তনমূলক মতবাদই রাষ্ট্রের উৎপত্তির সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করে। যদিও মাতৃতান্ত্রিক মতবাদ আদিম সমাজকাঠামোর ধারণা দেয় এবং সামাজিক চুক্তি মতবাদ জনগণের সম্মতির গুরুত্ব তুলে ধরে, কিন্তু বিবর্তনমূলক মতবাদ এই সব উপাদানকে একটি সমন্বিত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গার্নার মনে করেন, রাষ্ট্র কোনো কৃত্রিম সৃষ্টি নয়, বরং এটি একটি ক্রমবিবর্তনের ফল। সুতরাং, রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বুঝতে উদ্দীপকের এই তিনটি মতবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। এই মতবাদগুলো প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের ফসল।