ক.
ইবনে খালদুনের মতে, সমাজের ভিত্তি হলো 'গোত্র সংহতি'।
খ.
ইবনে খালদুনের 'আল আসাবিয়া' প্রত্যয়টি সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারার কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। আসাবিয়া প্রত্যয়টির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Social Solidarity যাকে বাংলায় বলা হয় সামাজিক সংহতি বা গোষ্ঠী সংহতি। ইবনে খালদুনের মতে, আসারিয়া বলতে গোত্র সংহতিকে বোঝায়। তার মতে, সমাজের ভিত্তিই হচ্ছে গোষ্ঠী সংহতি। রক্ত, জাতি ও ধর্ম সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক সংহতি গড়ে ওঠে। তিনি বলেন, উপজাতীয় সমাজে সামাজিক সংহতি সবচেয়ে দৃঢ়। তিনি মনে করেন, আসাবিয়ার বিভিন্নতার কারণে সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। আর এসব পরিবর্তন চক্রাকারে সংঘটিত হয়।
গ.
উদ্দীপকের 'A' দ্বারা সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ-কে নির্দেশ করা হয়েছে।
অগাস্ট কোঁৎ-এর জন্ম ১৭৯৮ সালের ১৯ জানুয়ারি ফ্রান্সের মন্টিপেলিয়ারে। তিনি মূলত সেন্ট সাইমনের চিন্তা ও দর্শন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। কোঁৎ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮৫৭সালের ৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। উদ্দীপকের ছক 'A' এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ রয়েছে। যা স্পষ্টত সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ-কে নির্দেশ করে।
অগাস্ট কোঁৎ-এর ত্রয়ম্ভর সূত্রই ছিল তার দর্শনের মূলভিত্তি। স্তর তিনটি হলো-
ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয় স্তর, অধিবিদ্যা সম্বন্ধীয় স্তর এবং দৃষ্টবাদী স্তর। ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয় স্তরে সমাজের ওপর ধর্মীয় প্রভাব ছিল অত্যধিক। এ স্তরে মানুষের মনে যুক্তিবাদী ধারণার সৃষ্টি হয়নি। এ যুগে মানুষ ছিল অদৃষ্টবাদী। মানুষের নৈতিক জ্ঞান ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। আদি থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত এ যুগ স্থায়ী ছিল। অধিবিদ্যা সম্বন্ধীয় স্তর একটি ক্রান্তিকালীন স্তর, যা ক্ষণস্থায়ী। এ স্তরে মানুষের দৃষ্টি প্রকৃতি এবং বাস্তবের দিকে আকৃষ্ট হয়। এ যুগ হচ্ছে তত্ত্বগত দার্শনিক চিন্তার যুগ। এ পর্যায়ের সমাজ ব্যবস্থাকে বিধিসম্মত বা আইনসম্মত (Legalitic) সমাজ বলা হয়। এখানে সামরিক সমাজের বৈশিষ্ট্য লোপ পেতে থাকে এবং শিল্প সমাজের বৈশিষ্ট্যের সূত্রপাত ঘটে। এ স্তর ত্রয়োদশ হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। Comte-র মতে, মানবসভ্যতা বিকাশের সর্বশেষ পর্যায় হলো Positive Stage (দৃষ্টবাদী স্তর)। তার মতে, এ পর্যায়ে মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত হয়, জ্ঞান উন্নত হয় এবং বিজ্ঞানের প্রকৃত জয়যাত্রা সূচিত হয়। কল্পনার পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয় এবং ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ পর্যায়ের সমকালীন সমাজ শিল্পসমাজ। শিল্পসমাজে শিল্পপতি ও বৈজ্ঞানিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে।
অগাস্ট কোঁৎ এ তিনটি স্তরকে চিহ্নিত করেছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, সমাজের তথা সমগ্র মানবজাতির উন্নতি ও ক্রমবিকাশ এ তিনটি তাত্ত্বিক স্তরের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়।
ঘ.
উদ্দীপকের 'B' তে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের কথা বলা হয়েছে।
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল ফ্রান্সের লরিন প্রদেশের ইপিনালে এমিল ডুর্খেইমের জন্ম। তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী। ১৮৯৩ সালে তিনি ফরাসি থিসিস 'The Division of Labour' এর ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ডুর্খেইম ১৯১৭ সালের ১৫ নভেম্বর মারা যান। উদ্দীপকের ছক 'B'-তেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ রয়েছে। যা সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমকেই নির্দেশ করে।
ডুর্খেইম তার 'The Suicide' গ্রন্থে আত্মহত্যাকে একটি সামাজিক ঘটনা হিসাবে দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত, মানসিক, বংশগত, ভৌগোলিক ও দৈহিক কারণে ঘটে না বরং সামাজিক সংহতি কম বা বেশি হওয়ার কারণে ঘটে থাকে। তার মতে, আত্মহত্যা একটি নিত্য ঘটনা, যা সমাজে প্রায়শ ঘটে। এমন কোনো সমাজ নেই যেখানে আত্মহত্যা সংঘটিত হয় না। ডুর্খেইম তিন প্রকার আত্মহত্যার কথা বলেছেন। যথা- আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা, পরার্থমূলক আত্মহত্যা' এবং নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। ব্যক্তি যখন সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন ব্যক্তির ওপর সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা, একাকিত্ববোধ, জীবনযাত্রার বিষণ্ণতা, সমাজের সীমাহীন প্রভাব, সামাজিক সাহায্য-সহযোগিতার অভাব ইত্যাদি কারণে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। দেশপ্রেমের স্বার্থে যুদ্ধে আত্মবিসর্জন, আত্মগ্লানিতে আত্মহত্যা, স্বেচ্ছায় সহমরণ প্রভৃতিকে ডুর্খেইম পরার্থপর আত্মহত্যা বলেছেন। ডুর্খেইমের মতে, যেসব সমাজে অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে সেসব সমাজে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা অধিক ঘটে। এছাড়া নিয়তিবাদী নামে আরও একটি আত্মহত্যার কথা তিনি বলেন।
পরিশেষে বলা যায়, এমিল ডুর্খেইমের আত্মহত্যা সম্পর্কিত মতবাদটি সামাজিক সংহতি ও গোষ্ঠী সংহতির সমন্বয়ে সংঘটিত একটি সামাজিক ঘটনা।