(ক) সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যখন উন্মুক্ত, স্পষ্ট এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়, তখন তাকে স্বচ্ছতা বলে।
(খ) সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য জবাবদিহিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। জবাবদিহিতা বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং তার কাজের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। এর প্রয়োজনীয়তার কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
- ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ: জবাবদিহিতা থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা স্বৈরাচারী হতে পারে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ কমে যায়।
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: জবাবদিহিতার ফলে কাজের প্রক্রিয়া উন্মুক্ত হয়, যা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
- জনসেবার মানোন্নয়ন: যখন কর্মকর্তারা তাদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকেন, তখন তারা জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ও কার্যকর সেবা প্রদানে সচেষ্ট হন।
- গণতন্ত্রের সুরক্ষা: জবাবদিহিতা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি, যা নাগরিক অধিকার রক্ষা করে এবং শাসনব্যবস্থাকে গণমুখী করে তোলে।
(গ) উদ্দীপকের লেখচিত্রটির '?' চিহ্নিত স্থানে আমার পাঠ্যবইয়ের 'পৌরনীতি ও সুশাসন' বিষয়টির পরিধি ও বিষয়বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা: পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো নাগরিক। একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন, সফলতা বা ব্যর্থতা নাগরিকের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে। নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র সচল ও প্রাণবন্ত থাকে। উদ্দীপকের লেখচিত্রে 'নাগরিক', 'অধিকার ও কর্তব্য' এবং 'রাষ্ট্র', এই বিষয়গুলো পৌরনীতির মৌলিক আলোচনার বিষয়বস্তু।
পাশাপাশি, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নাগরিকতা কেবল জাতীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। বিশ্বশান্তি ও বন্ধুত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং বিশ্বমানবতার ধারণা পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধির অন্তর্ভুক্ত। উদ্দীপকের লেখচিত্রে 'বিশ্বমানবতা'র উল্লেখ এই আন্তর্জাতিক নাগরিকতার দিকটি নির্দেশ করে।
সুতরাং, নাগরিক, রাষ্ট্র, অধিকার-কর্তব্য এবং বিশ্বমানবতার এই সমন্বিত রূপটি মূলত পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়টির পরিধি ও বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করে।
(ঘ) হ্যাঁ, আমি মনে করি উদ্দীপকে উল্লিখিত বিষয়টি অর্থাৎ 'পৌরনীতি ও সুশাসন' নাগরিককে কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
সুনাগরিক হলেন তিনি, যিনি রাষ্ট্রের আইন মেনে চলেন, নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেতন থাকেন, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একজন সুনাগরিকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দেশপ্রেম, শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং বিবেকবোধ।
পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের মাধ্যমে একজন নাগরিক নিম্নোক্তভাবে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে:
- অধিকার ও কর্তব্যের সমন্বয়: এই বিষয়টি নাগরিককে শেখায় যে অধিকার এবং কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক। অধিকার ভোগ করতে হলে কর্তব্য পালন অপরিহার্য, এই বোধ তাকে দায়িত্বশীল করে তোলে।
- নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়ন: সততা, সহনশীলতা, উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতার মতো গুণাবলি এই বিষয়ের আলোচনার মাধ্যমে নাগরিকের মধ্যে বিকশিত হয়, যা তাকে সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে।
- সুশাসনের ধারণা: আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার গুরুত্ব জানার ফলে নাগরিক রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং অন্যায় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে।
- বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বমানবতা সম্পর্কে জানার ফলে নাগরিক কেবল নিজ দেশের প্রতি নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠে।
পরিশেষে বলা যায়, পৌরনীতি ও সুশাসন কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করে না, বরং এটি নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ পরিবর্তন করে তাকে একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।