(ক)
ল্যাটিন শব্দ 'Natio'-এর অর্থ হলো জন্ম বা বংশ।
(খ)
জাতীয়তার দ্বিমাত্রা বলতে মূলত জাতীয়তা নির্ধারণের দুটি প্রধান নীতি বা দৃষ্টিকোণকে বোঝায়, যথা- সাংস্কৃতিক বা নৃতাত্ত্বিক মাত্রা এবং ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক মাত্রা। সাংস্কৃতিক মাত্রা অনুযায়ী একই বংশ, ভাষা বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তা নির্ধারিত হয়; অন্যদিকে ভৌগোলিক মাত্রায় নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনে এই দুই মাত্রার সমন্বয় বা যেকোনো একটির প্রাধান্য বিশেষ ভূমিকা রাখে।
(গ)
উদ্দীপকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তা গঠনের উপাদানগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। জাতীয়তার প্রধান উপাদানগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্য: এটি জাতীয়তাবোধের অন্যতম শক্তিশালী উপাদান। যখন কোনো জনসমষ্টির ভাষা ও সংস্কৃতি এক হয়, তখন তাদের মধ্যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। উদ্দীপকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐক্য গড়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে।
২. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ঐক্য: অভিন্ন অতীত স্মৃতি ও সংগ্রামের ইতিহাস একটি জনসমষ্টিকে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৫২ সালের আত্মত্যাগ পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
৩. মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য: এটি জাতীয়তা গঠনের মৌলিক ও শ্রেষ্ঠ উপাদান। জনগণের মানসিক গঠন ও ভাবগত ঐক্যই তাদের অন্যদের থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে পরিচয় দেয়।
৪. রাজনৈতিক ঐক্য: যখন কোনো জনসমষ্টি একই রাজনৈতিক লক্ষ্য বা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সংগঠিত হয়, তখন জাতীয়তা পূর্ণতা পায়।
(ঘ)
উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালি জাতীয়তা গঠন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। জাতীয়তাবোধের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। যখন কোনো জনসমাজের অধিকাংশ মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি অভিন্ন হয়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের সহজাত ও গভীর ঐক্যানুভূতি তৈরি হয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন মূলত এই ভাষাগত ঐক্যেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালিরা প্রথম বুঝতে পেরেছিল যে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা। এই স্বতন্ত্র বোধই পরবর্তীতে জাতীয়তাবোধকে সুসংহত করে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখায়।
পরিশেষে বলা যায়, ভাষা ও সংস্কৃতির এই নিবিড় ঐক্যই বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে সাহায্য করেছে। লর্ড ব্রাইসের মতে, জাতীয়তা যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে তখনই তা জাতিতে পরিণত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যদি ভাষা ও সংস্কৃতি না হতো, তবে ১৯৭১ সালে একটি সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হতো না। তাই রাষ্ট্র গঠনে ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।