(ক)
মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমত্ববোধ, আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসাই হচ্ছে দেশপ্রেম।
(খ)
হ্যাঁ, উগ্র জাতীয়তাবাদ বিশ্বশান্তির জন্য নিঃসন্দেহে হুমকিস্বরূপ। জাতীয়তাবাদ হলো নিজ জাতির প্রতি ভালোবাসা ও একাত্মবোধের মানসিক অনুভূতি। যখন এই অনুভূতি অন্য সকল জাতি ও দেশকে হেয় করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ বলা হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অন্য দেশে আক্রমণ বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে, যা বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জার্মানির হিটলার এবং ইতালির মুসোলিনির উগ্র জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, যা বিশ্বশান্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছিল।
(গ)
উদ্দীপকে জাতীয়তার 'ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য' উপাদানটি লক্ষ করা যায়।
ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। কোনো জনসমষ্টির ভাষা ও সাহিত্য এক হলে তাদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্যবোধ ও জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। উদ্দীপকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের উল্লেখ রয়েছে, যা বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। এই ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবোধের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ছয় দফা কর্মসূচি, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। উদ্দীপকের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতীয়তা গঠনে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
(ঘ)
উদ্দীপকে বর্ণিত ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ছাড়াও জাতীয়তা গঠনের অন্যান্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিচে বর্ণনা করা হলো:
১. ভৌগোলিক ঐক্য: জাতীয়তা গঠনের প্রথম ও প্রধান উপাদান হলো ভৌগোলিক ঐক্য। একই ভৌগোলিক সীমানায় দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে জনসমষ্টির মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ঘটে এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে, যা জাতীয়তা সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
২. বংশগত ঐক্য: রক্ত সম্পর্ক ও বংশগত ঐক্য মানুষের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে। একই বংশোদ্ভূত বা একই রক্তধারার মানুষ নিজেদের মধ্যে একাত্মতা অনুভব করে, যা জাতীয়তাবোধের বিকাশে সহায়ক। তবে আধুনিককালে এটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয় না।
৩. ধর্মীয় ঐক্য: জাতীয়তা গঠনে ধর্মীয় ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। একই ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহজেই ঐক্যভাব জাগ্রত হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনেক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে, যেমন ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি।
৪. ভাবগত ঐক্য: জাতীয়তা গঠনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাবগত ঐক্য। এটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক চেতনা। অধ্যাপক লাস্কির মতে, জাতীয়তার ধারণাটি অপরিহার্যভাবেই একটি আত্মিক ব্যাপার। ভৌগোলিক বা অন্যান্য উপাদান থাকলেও ভাবগত ঐক্য ছাড়া জাতীয়তাবোধের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, জাতীয়তা কোনো একক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, বরং বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়।