ক.
বাংলাদেশ ১৯৫৫ সালে পেশাদার সমাজকর্ম শিক্ষাযাত্রা শুরু করে।
খ.
সমাজসেবার প্রথম সূত্রপাত ঘটে ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডে মূলত বিশ শতক থেকে সমাজকর্ম শিক্ষার প্রবর্তন ঘটে। মধ্যযুগে গির্জার মাধ্যমে ইংল্যান্ডে গরিব-দুঃখী এবং পঙ্গুদের সেবা করা হতো।
এ সেবাদান ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে সরকারি সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভকরে। পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে সরকারি উদ্যোগে সমষ্টিকেন্দ্রিক সেবার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ধরনের সেবার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত সমাজসেবা এবং পারিবারিক সেবার উন্নয়ন। এ ধরনের সেবাকে আরও অর্থপূর্ণ করার লক্ষ্যে তিনটি আইন প্রণীত হয়। এগুলো হলো- The Mental Act, 1983; The Children Act, 1989 এবং The Health and Community Care Act, 1990। এসব আইনের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে সমাজসেবা ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়।
গ.
উদ্দীপকে সমাজকর্ম পেশার যে প্রয়োগক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে তা হচ্ছে সংশোধনমূলক কার্যক্রম, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা সেবা। নিচে এগুলো ব্যাখ্যা করা হলো-
১. সংশোধনমূলক কার্যক্রম: কিশোর অপরাধী ও অপরাধীদের প্রবেশন, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা, আটকাদেশ, জেল ও দণ্ডপ্রাপ্তদের সমাজকর্ম ও দল সমাজকর্ম, সংশোধন ক্যাম্প, সাজাপ্রাপ্তদের সামঞ্জস্য বিধান, সমষ্টিতে ফিরে আসার পরিবেশ সৃষ্টি, কিশোরদের জন্য প্যারোল সেবা, বয়স্কদের মুক্তিদানে সহায়তা, সমষ্টি সেবা প্রভৃতি।
২. অপরাধ নিয়ন্ত্রণ : 'অপরাধী নয় বরং অপরাধকে ঘৃণা কর।' এ মতবাদকে সামনে রেখে অপরাধীদের শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। সাধারণত অপরাধীদের চরিত্র সংশোধন ও পুনর্বাসনের জন্য মানবিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাবলিকে সংশোধনমূলক কার্যক্রম বলা হয়। বাংলাদেশে অপরাধের প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইদানীং অপরাধের সাথে আরেকটি শব্দ যোগ হচ্ছে কিশোর অপরাধ। কিশোররা কখনো বুঝে, কখনোবা না বুঝে আবেগের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধীর চরিত্র সংশোধন ও অপরাধপ্রবণতা হ্রাস করার জন্য একজন সমাজকর্মী সংশোধন ও শিক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
৩. চিকিৎসা সেবা: শিশু স্বাস্থ্য, সুস্থ শিশু কেন্দ্র, ডিসপেনসারি, শিশু সম্মেলন, পরিদর্শন নার্স, সেবা, সরকারি সাহায্যে গ্রহীতাদের সেবা, পুনর্বাসন, অন্ধ, বোবা, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ প্রভৃতি রোগের সরকারি ও বেসরকারি উপায়ে সেবাদান।
ঘ.
সমাজকর্ম পেশার সফল প্রয়োগে অনেকগুলো সমস্যা বিদ্যমান। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো-
১. মূল্যবোধের অভাব : বস্তুগত সম্পদ ও বৈষয়িক বিষয়ে মানসিকভাবে বেশি নির্ভরতার কারণে সঠিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে উপেক্ষা কাজ করে। শাস্তির চেয়ে সংশোধন ভালো -এ বিষয়ে তাদের কমই আগ্রহ দেখা যায়।
২. অর্থাভাব: সমাজকর্ম মনোসামাজিক ও মানসিক সমস্যা সমাধানে সরাসরি কার্যকর। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। এজন্য তারা মনোসামাজিক ও মানসিক সমস্যার চাইতে মৌল মানবিক চাহিদা পূরণে সবাই ব্যস্ত। ফলে অন্যদিকে দৃষ্টিদানের মতো সুযোগ ও প্রচেষ্টা সরকার বা জনগণের কারোরই নেই।
৩. কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা: সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। তথাপিও কর্তৃপক্ষ সমাজকর্মের স্বীকৃতি প্রদানে উদাসীন।
৪. বেসরকারি উদ্যোগের অভাব: একদিকে সরকারি পর্যায়ে সমাজকর্ম সম্পর্কে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। অন্যদিকে, বেসরকারি পর্যায়েও কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে সমাজকর্ম সম্পর্কে জনগণের কোনো আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে না।
৫. ব্যক্তিগত স্বার্থ : আমাদের অল্প সংখ্যক সমাজকর্মী নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে সামগ্রিক স্বার্থে চিন্তা করে না। এটি কোনো পেশার জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
৬. দায়িত্বশীলতা ও মানসিকতার অভাব: অনেক ক্ষেত্রে সমাজকর্মে ডিগ্রিধারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে উদাসীন। তাছাড়া ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেকেই পরবর্তীতে সমাজকল্যাণ ক্ষেত্রে কাজ করতে উৎসাহী হয় না। কিন্তু সমাজকর্ম বাস্তবায়ন ও এর উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণকর্মীর খুবই প্রয়োজন।
৭. কুসংস্কার: বাংলাদেশের বহু লোক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে পরিকল্পিত পরিবর্তনে বিশ্বাসী নয়। তারা দান-সদকা প্রদান ও গ্রহণে আগ্রহী; স্থায়িভাবে সমস্যা সমাধানে বা প্রতিরোধ ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহী নয়।
তাছাড়াও অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত ধারণা, রাষ্ট্রীয় নীতির অভাব, সংগঠনের অভাব, দেশীয় উপকরণের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, পেশাগত মূল্যবোধ ও মানদণ্ডের অভাব, মুখপাত্রের অভাব বহুলাংশে দায়ী।