(ক)
জীবের জিনোম বা ক্রোমোজোমে অবস্থিত ডিএনএ (DNA) অণুর ক্ষারক অনুক্রমের যে কোনো আকস্মিক ও স্থায়ী পরিবর্তন যা বংশপরস্পরায় সঞ্চারিত হতে পারে, তাকে পরিব্যক্তি বা মিউটেশন (Mutation) বলে।
(খ)
যেসব অঙ্গ জীবের পূর্বপুরুষে সুগঠিত ও সক্রিয় ছিল, কিন্তু পরিবেশ বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে পরবর্তী বংশধরদের দেহে অগঠিত, অকার্যকর ও অবশেষ হিসেবে রয়ে গেছে, সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (Vestigial organ) বলে। যেমন—মানুষের চোখের উপপল্লব (nictitating membrane), আক্কেল দাঁত, ককসিক্স বা পুচ্ছাচ্ছি, অ্যাপেন্ডিক্স ইত্যাদি।
(গ)
উদ্দীপকে উল্লেখিত স্বাভাবিক মা-বাবার সন্তান বিপুল মূক ও বধির। এটি জিনতত্ত্বের দ্বৈত প্রচ্ছন্ন এপিস্ট্যাসিস (Duplicate recessive epistasis)-এর একটি উদাহরণ। নিচে এর জিনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
ধরা যাক, মানুষের স্বাভাবিক বাক-শ্রবণ ক্ষমতার জন্য দুটি ভিন্ন লোকাসে অবস্থিত দুটি প্রকট জিন $D$ এবং $E$ দায়ী। এদের যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে অর্থাৎ হোমোজাইগাস প্রচ্ছন্ন অবস্থায় ($dd$ বা $ee$) থাকলে মানুষ মূক ও বধির হয়।
এখানে,
স্বাভাবিক বাক-শ্রবণক্ষম ব্যক্তির জিনোটাইপ: $D\_E\_$ (যেমন: $DDEE$, $DDEe$, $DdEE$, $DdEe$)
মূক ও বধির ব্যক্তির জিনোটাইপ: $DDee$, $Ddee$, $ddEE$, $ddEe$, $ddee$
বিপুলের মা-বাবা উভয়েই স্বাভাবিক ছিলেন, কিন্তু তাদের সন্তান বিপুল মূক ও বধির হয়েছে। এর অর্থ হলো বিপুলের মা-বাবা উভয়েই এই বৈশিষ্ট্যের জন্য হেটারোজাইগাস বা বাহক ছিলেন। অর্থাৎ তাদের জিনোটাইপ ছিল $DdEe$।
পিতা-মাতার জিনোটাইপ $DdEe$ হলে তাদের গ্যামেটগুলো হবে: $DE$, $De$, $dE$, $de$।
এদের মধ্যে ক্রস ঘটালে সন্তানদের জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপিক অনুপাত নিচে চেকারবোর্ডের মাধ্যমে দেখানো হলো:
| গ্যামেট |
$DE$ |
$De$ |
$dE$ |
$de$ |
| $DE$ |
$DDEE$ (স্বাভাবিক) |
$DDEe$ (স্বাভাবিক) |
$DdEE$ (স্বাভাবিক) |
$DdEe$ (স্বাভাবিক) |
| $De$ |
$DDEe$ (স্বাভাবিক) |
$DDee$ (মূক-বধির) |
$DdEe$ (স্বাভাবিক) |
$Ddee$ (মূক-বধির) |
| $dE$ |
$DdEE$ (স্বাভাবিক) |
$DdEe$ (স্বাভাবিক) |
$ddEE$ (মূক-বধির) |
$ddEe$ (মূক-বধির) |
| $de$ |
$DdEe$ (স্বাভাবিক) |
$Ddee$ (মূক-বধির) |
$ddEe$ (মূক-বধির) |
$ddee$ (মূক-বধির) |
চেকারবোর্ড থেকে দেখা যায় যে, সন্তান স্বাভাবিক হওয়ার জন্য উভয় প্রকট জিন ($D$ এবং $E$) একসাথে থাকা আবশ্যক। বিপুল যেহেতু মূক ও বধির, তাই তার জিনোটাইপে যেকোনো এক জোড়া প্রচ্ছন্ন জিন হোমোজাইগাস অবস্থায় (যেমন: $dd$ বা $ee$ বা $ddee$) এসেছে। পিতা-মাতা উভয়েই হেটারোজাইগাস ($DdEe$) হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে কোনো প্রচ্ছন্ন জিন হোমোজাইগাস অবস্থায় ছিল না, তাই তারা স্বাভাবিক ছিলেন। কিন্তু বিপুলের ক্ষেত্রে জিনগত বিন্যাসের কারণে প্রচ্ছন্ন জিন হোমোজাইগাস অবস্থায় আসায় সে মূক ও বধির হয়েছে।
(ঘ)
উদ্দীপকে উল্লেখিত ঘটনাটি মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রের (স্বাধীনভাবে সঞ্চারণের সূত্র) একটি ব্যতিক্রম। নিচে এর সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হলো:
মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের মধ্যে ক্রস ঘটালে $F_2$ জনুর ফিনোটাইপিক অনুপাত হওয়ার কথা $9:3:3:1$। কিন্তু উদ্দীপকের ঘটনাটি দ্বৈত প্রচ্ছন্ন এপিস্ট্যাসিস (Duplicate recessive epistasis)-এর কারণে ঘটে থাকে, যার ফলে এই অনুপাত পরিবর্তিত হয়ে $9:7$ হয়।
যুক্তি:
১. দ্বৈত প্রচ্ছন্ন এপিস্ট্যাসিস প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন লোকাসে অবস্থিত দুটি প্রচ্ছন্ন অ্যালিল যখন হোমোজাইগাস অবস্থায় থাকে, তখন তারা একে অপরের প্রকট অ্যালিলের বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাধা দেয়।
২. মানুষের জন্মগত মূক ও বধিরতার ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন লোকাসের প্রচ্ছন্ন জিন ($d$ এবং $e$) দায়ী। যদি কোনো ব্যক্তির জিনোটাইপে $dd$ বা $ee$ থাকে, তবে প্রকট জিন $E$ বা $D$ থাকা সত্ত্বেও সে মূক ও বধির হবে। অর্থাৎ স্বাভাবিক বাক-শ্রবণ ক্ষমতার জন্য $D$ এবং $E$ উভয় প্রকট জিনের উপস্থিতি আবশ্যক।
৩. (গ) অংশে প্রদর্শিত চেকারবোর্ড অনুযায়ী, $F_2$ জনুর ১৬টি বিন্যাসের মধ্যে ৯টি বিন্যাসে উভয় প্রকট জিন ($D$ এবং $E$) একসাথে উপস্থিত থাকে, ফলে তারা স্বাভাবিক বাক-শ্রবণক্ষম হয়।
৪. অবশিষ্ট ৭টি বিন্যাসে অন্তত এক জোড়া প্রচ্ছন্ন জিন হোমোজাইগাস অবস্থায় ($dd$ বা $ee$ বা $ddee$) থাকে, ফলে তারা মূক ও বধির হয়।
অতএব, $F_2$ জনুর ফিনোটাইপিক অনুপাত দাঁড়ায়:
স্বাভাবিক : মূক ও বধির = $9:7$
যেহেতু এই অনুপাতটি মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রের স্বাভাবিক অনুপাত $9:3:3:1$-এর পরিবর্তে $9:7$ হয়, তাই বলা যায় যে উদ্দীপকের ঘটনাটি মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রের একটি ব্যতিক্রম।