ক.
দলের মধ্যেই যখন কিছু সদস্য দলীয় নীতি ও কর্মসূচির বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে কিংবা বৃহৎ স্বার্থের কথা ভুলে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ হয় তখন তাকে উপদল বলে।
খ.
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী এমন একটি জনসমষ্টি, যার সদস্যগণ সমজাতীয় মনোভাব এবং স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ। ক্ষমতা দখলের কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই, বরং নিজেদের স্বার্থোদ্ধারই মূল লক্ষ্য। চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলো সরকারের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সরকারের নীতি অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তারা গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সতর্ক করে দেয়। এতে সংশোধিত না হলে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি পালনে বাধ্য করে।
গ.
সুষমা যে দেশে বেড়াতে গিয়েছে, সেখানে একদলীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। যখন কোনো দেশে সাংবিধানিকভাবে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল থাকে
তাকে একদলীয় ব্যবস্থা বলে। একদলীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল ব্যতীত অন্য সকল দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড একটিমাত্র রাজনৈতিক দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচির ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ফলে দেশে গণতান্ত্রিক রীতি- নীতি ভুলুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যক্তির মত প্রকাশ, সংগঠন করা এবং সরকারের সমালোচনার সুযোগ থাকে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জার্মানিতে হিটলারের 'নাৎসি দল', ইতালিতে মুসোলিনির 'ফ্যাসিস্ট দল' একদলীয় ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত। এছাড়া বর্তমানে চীন, উত্তর কোরিয়া, কিউবা প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, সুষমা যে দেশে বেড়াতে গিয়েছে, সেদেশের আইনসভায় সরকারি সিদ্ধান্তের কোনো বিরোধিতা নেই। এতেই প্রমাণিত হয় যে, সেখানে কোনো কার্যকর বিরোধী দল নেই। যা মূলত একদলীয় ব্যবস্থাকেই নির্দেশ করে।
ঘ.
উদ্দীপকে উল্লিখিত সুষমার দেশে কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা হয়ে থাকে; যা বহুদলীয় ব্যবস্থাকে নির্দেশ করে।
একটি রাষ্ট্রে দুইয়ের অধিক রাজনৈতিক দল সরকারি ক্ষমতা লাভের লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে তাকে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলে। এধরণের ব্যবস্থায় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার গঠন করতে পারে; আবার অনেক সময় সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে 'সম্মিলিত সরকার' (Coalition Government) গঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। এ ব্যবস্থার কিছু দোষ-গুণ রয়েছে। বহুদলীয় ব্যবস্থার গুণগুলো হলো-
প্রথমত, বহুদলীয় ব্যবস্থা সমাজের ভিন্নমুখী জনমত প্রকাশে সহায়তা করে। কেননা, একটি দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকায় জনগণ তাদের পছন্দের দলের নীতি-আদর্শের সাথে একমত পোষণ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বহুদলীয় ব্যবস্থায় কোনো দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে স্বৈরাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না।
তৃতীয়ত, বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল বক্তব্য-বিবৃতি এবং আলোচনার মাধ্যমে তাদের নীতি ও কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরে। আবার বিরোধী রাজনৈতিক দল সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করে। এর ফলে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটে।
চতুর্থত, বহুদলীয় ব্যবস্থায় আইনসভার নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সহজে সম্ভব হয় না। এর ফলে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে রাজনৈতিক জোট গঠনের বা 'সম্মিলিত সরকার' গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে সংখ্যালঘু শ্রেণিও সরকার গঠনে অংশ নিয়ে স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে।
বহুদলীয় ব্যবস্থায় গুণের পাশাপাশি কিছু দোষও বিদ্যমান। যেমন- এ ব্যবস্থায় সরকার সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হয়। কারণ সরকার একতরফা
নীতি গ্রহণ করলে বা বিরোধীদের মতামতকে গুরুত্ব না দিলে সরকার পতনের আন্দোলন দেখা দেয়। বহুদলীয় ব্যবস্থার আরেকটি বড় অসুবিধা হলো দলগুলোর মধ্যে অবিরাম অন্তর্দ্বন্দ্ব। এরূপ অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন প্রায়ই বিশৃঙ্খল ও উত্তপ্ত থাকে। ফলে সবসময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। আবার বহুদলীয় ব্যবস্থায় অনেকসময় সাধারণ নির্বাচনে অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ প্রার্থীগণ আইনসভায় নির্বাচিত হয়ে আসেন। ফলে প্রশাসনিক কাজের জন্য তারা আমলাদের ওপর নির্ভর করেন। আমলারাও এ সুযোগে তাদের ওপর নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করেন।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বহুদলীয় ব্যবস্থা অবশ্যই কাম্য। তবে দলগুলোকে সুগঠিত হতে হবে, যাতে প্রত্যেক দলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলন ঘটে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়।